নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মালয়েনিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দায়িত্ব পালন করলেও এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের প্রতি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমত, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিজ নিজ প্রভাব প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসামরিক জনগণের ওপর সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা ফিরে যাওয়ার আস্থা পান। তৃতীয়ত, শরণার্থী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে দীর্ঘমেয়াদি আতিথেয়তার কারণে স্থানীয় উন্নয়ন ব্যাহত না হয়। চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের স্বার্থে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য তদন্ত ব্যবস্থাকে সহযোগিতা দিয়ে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পঞ্চমত্ব, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার এবং অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
মিয়ানমারে দশকের পর দশক ধরে চলা বৈষম্য ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে এবং শিবিরগুলোতে প্রতিবছর নতুন শিশুর জন্ম হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে একটি নতুন প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে। সরকার প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে শিশুদের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা ও যুবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করলেও শরণার্থী শিবির দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য কোনো আদর্শ স্থান হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা হ্রাসের তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, ২০২৬ সালের জন্য যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে মানবিক সহায়তার এই ঘাটতি কোনোভাবেই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না এবং অনির্দিষ্টকাল একা বাংলাদেশের পক্ষে এই বোঝা বহন করা সম্ভব নয়।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তাই সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারেই নিহিত থাকায় এর সমাধানও সেখানেই খুঁজতে হবে। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিছক নিপীড়ন ও বিতাড়নের গল্পে পর্যবসিত না হয়, বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও নতুন আশার প্রতীকে পরিণত হয় এবং সেই পরিবর্তনের সূচনা যেন এখনই নিশ্চিত করা হয়।