চার শতাধিক বন্দ ধারণক্ষমতার বিপরীতে পাঁচ গুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও মানবেতর পরিস্থিতিতে চলছে প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের কার্যক্রম। গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৪২৩ জন বন্দ ধারণক্ষমতার এই কারাগারে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা ২ হাজার ১৬৪ জন। অতিরিক্ত এই বন্দিপাড়ার চাপ সামলাতে গত দুই মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বন্দিকে পার্শ্ববর্তী তিনটি জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হলেও অবস্থার কোনো স্থায়ী উন্নতি হয়নি। ফলে সার্বিক বন্দি ব্যবস্থাপনা ও কারাগারের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে।
প্রায় ২৩৪ বছরের ঐতিহাসিক এই কারাগারে বন্দির ক্রমবর্ধমান চাপ নিরসনে ২০১৫ সালে ‘ময়মনসিংহ কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। দুই হাজার বন্দি রাখার সক্ষমতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্যে হাতে নেওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০১৭ সালে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ হয়নি। পর্যাপ্ত মাস্টারপ্ল্যানের অভাব, নকশায় বারবার পরিবর্তন এবং করোনা মহামারীর অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় দুই-ই দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। শুরুতে এর ব্যয় প্রায় ১২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা ধরা হলেও, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৪০ কোটি টাকায় এবং কাজের প্যাকেজ ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ৩০টিতে উন্নীত করা হয়।
প্রকল্পের কাজের বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট দ্বিমুখী অবস্থান। গণপূর্ত অধিদপ্তর দাবি করছে যে কাজের সামগ্রিক অগ্রগতি প্রায় ৭৫ শতাংশ। তবে ময়মনসিংহের কারা কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও হিসাব অনুযায়ী, দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি কোনোভাবেই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়। কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে চলমান এই নির্মাণকাজের কারণে একদিকে বন্দিদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে কারা প্রশাসনের স্বাভাবিক দাপ্তরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কারাগারে বন্দি থাকা ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ মাদক, যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলার আসামি এবং রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা। জেলার মো. সোহরাব হোসেন জানিয়েছেন, চলমান সম্প্রসারণ প্রকল্পের একটি অংশ শেষ হওয়ায় ইতোমধ্যে নারী বন্দিদের সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে, তবে পুরুষ বন্দিদের অংশের কাজ চলায় নির্ধারিত জায়গা খালি রাখতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের মতে, দীর্ঘসূত্রতায় জর্জরিত এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত সমাপ্ত করা না গেলে কারাগারটির ভেতরে বন্দিদের মানবিক সংকট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।