মাগুরায় প্রকৌশলীর বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে

নিজের শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মাগুরার তরুণ প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান (৩৬)। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া এই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি যেমন পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন করছেন, তেমনি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে প্রতি মাসে আর্থিক আয়ও করছেন। মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের মন্ডলের ছেলে আখতারুজ্জামানের এই যুগান্তকারী উদ্যোগ বর্তমানে স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে গোটা অঞ্চলেই ব্যাপক প্রশংসার কুড়াচ্ছে।

রাজধানীর নবাবপুর থেকে বিশেষ এজেন্সির মাধ্যমে বিএসটিআই এবং স্রেডা (স্রেডা) অনুমোদিত ‘ওমেপা’ ও ‘জিংকো জে.এ’ কোম্পানির মোট নয়টি উন্নতমানের সোলার প্যানেল সংগ্রহ করে নিজের একতলা ভবনের ছাদে স্থাপন করেন এই প্রকৌশলী। প্রতিটি প্যানেলের উৎপাদন ক্ষমতা ৫৫০ থেকে ৬৩০ ওয়াটের মধ্যে। ‘সালেহা অয়েল মিল’ নামের এই নেট মিটারিং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তার মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। বর্তমানে এই অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৯ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা স্থানীয় জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

অনগ্রিড ইনভার্টার প্রযুক্তির সর্বাধুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ সরাসরি মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। মাগুরা-যশোর সড়কের কেচুয়াডুবি এলাকায় অবস্থিত প্রকৌশলী আখতারুজ্জামানের ‘সালেহা অয়েল মিল’ ও ‘সালেহা এলপিজি স্টেশন’-এর মোট বিদ্যুৎ ও আলোর চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই মেটানো হচ্ছে এই সৌরবিদ্যুৎ থেকে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাহিদা শতভাগ মিটিয়ে যে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকছে, তা নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। সংগৃহীত হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ ইউনিট উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে জমা হচ্ছে, যার বিপরীতে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হিসেবে তিনি মাসে প্রায় ৭ হাজার ৩৫০ টাকা আয় করছেন।

কেবল নিজের প্রতিষ্ঠানের লাভ কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাঝেই এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখেননি প্রকৌশলী আখতারুজ্জামান। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও এর ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আগ্রহী তরুণদের তিনি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও তাত্ত্বিক ধারণা দিয়ে যাচ্ছেন। তার এই সফল উদ্যোগ দেখতে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছেন বহু শিক্ষিত তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তারা। তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. তানভীর জানান, এই সোলার প্রজেক্টটি তরুণ প্রজন্মকে আত্মনির্ভরশীল হতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে। এছাড়া স্থানীয় তরুণ অমিত মিত্র বলেন, নিজের বাসায় ছোট পরিসরে সোলার প্যানেল স্থাপন করলেও আখতার ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ নিয়ে তিনি ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন।

বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে উদ্যোক্তা মো. আখতারুজ্জামান জানান, সৌরবিদ্যুৎ সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর জাতীয় চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে যদি আরও একটু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রশাসনিক উৎসাহ পাওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে এই প্রকল্পকে আরও বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃতি করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. মহিতুল ইসলাম এই উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প। প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান নিজ উদ্যোগে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে এই মহৎ কাজে অনন্য অবদান রাখছেন। তার এই সময়োপযোগী ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ আগামী দিনে দেশের অন্য উদ্যোক্তাদেরও এমন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে এগিয়ে আসতে গভীরভাবে উৎসাহিত করবে।

০%
০%
০%
০%