মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতির পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা দূর করতে ভারসাম্যপূর্ণ ও অভিনব এক পদক্ষেপ হিসেবে ত্রৈমাসিকভিত্তিক নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার বিকেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান এই নতুন মুদ্রানীতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কে কেন্দ্র করে এই মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রচলিত ষাণ্মাসিক ধারা থেকে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন।

দীর্ঘদিন ধরে দেশে বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রচলন থাকলেও অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই ত্রৈমাসিক বা তিন মাস মেয়াদি মুদ্রানীতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান জানান, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং একইসঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো—উভয় বিষয়কেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় রেখেই নতুন মুদ্রানীতির রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এখনো আট শতাংশের ওপরে অবস্থান করলেও বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে মূলত উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণের চাহিদা কমেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এর আগে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনতে গত আগস্ট মাসে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হলেও ঋণের প্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোই বর্তমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের এখন প্রধান নজর রয়েছে নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ঋণপ্রবাহের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ধরনের কৌশলগত অবস্থান নেয় তার ওপর। তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলে অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনকল্যাণমুখী ধারার সঙ্গে সংগতি রেখে মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল খাতকে গতিশীল করতে এই মুদ্রানীতি কতটুক কার্যকর ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

০%
০%
০%
০%