জয়পুরহাটে হিমাগারের আলুতে বড় লোকসানে দিশেহারা চাষী ও ব্যবসায়ীরা

উত্তর জনপদের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাটে এবার বাম্পার ফলন সত্ত্বেও চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। বাজারে আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় উৎপাদন ও সংরক্ষণের খরচ তো উঠেই আসছে না, বরং প্রতি কেজি আলু বিক্রি করতে গিয়ে ৬ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এতে করে ঋণের জালে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে হাজারো প্রান্তিক কৃষকের, যা আসন্ন কৃষিমৌসুমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় মোট ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৫৯৪ মেট্রিক টন। স্থানীয়দের খাদ্য চাহিদা ও বীজের জোগান নিশ্চিত করার পর উদ্বৃত্ত আলু সংরক্ষণের জন্য জেলায় বর্তমানে ২২টি হিমাগার চালু রয়েছে। এর মধ্যে কালাইয়ে ১৪টি, ক্ষেতলালে ৪টি, পাঁচবিবিতে ২টি এবং আক্কেলপুর উপজেলায় ২টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে খাদ্য ও বীজ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য ২ লাখ ১৫ হাজার ৯৮২ মেট্রিক টন আলু রাখা হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে কম দামে আলু বিক্রি না করে ভালো দামের আশায় কৃষকরা হিমাগারের শরণাপন্ন হলেও বাজারের বর্তমান নিম্নমুখী প্রবণতা তাদের সমস্ত হিসাব উল্টে দিয়েছে।

মাঠপর্যায়ের হিসাব বলছে, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ১৭ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া বাবদ যুক্ত হয়েছে ৬ টাকা এবং পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজির চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ থেকে ২৪ টাকায়। অথচ বাজারে বর্তমান পাইকারি দর মাত্র ১৪ থেকে ১৫ টাকা। ফলে প্রতি কেজি আলু বিক্রি করলেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে ৬ থেকে ৭ টাকা করে খেসারত দিতে হচ্ছে। আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে বাকি আলুও খালাস করতে হবে, যা কৃষকদের আরও বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সদরের হিমাগারে ৬০০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করা রফিকুল ইসলাম জানান, বাজারদর এতটাই পড়ে গেছে যে উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ তো দূরে থাক, বস্তাপ্রতি ৪শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। একই দুর্দশার কথা জানিয়ে প্রায় ৬০ বিঘা জমির চাষি মিঠু হোসেন বলেন, প্রতি বস্তা আলুতে ১২শ টাকার মতো খরচ হলেও বাজারদরে তা বিক্রি করে হিমাগার ভাড়া বাদে মাত্র ৫শ টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরবর্তী মৌসুমে কীভাবে চাষাবাদ করবেন এবং ঋণ কীভাবে শقোধ করবেন, তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তিনি।

হিমাগার ও স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যারা আলু চাষ ও ব্যবসা করেছিলেন, বাজারে দরপতনের কারণে তারা এখন চরম অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী তাদের শেষ সম্বলটুকু হারাতে বসেছেন। আলু ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন ও সবুজ মিয়া জানান, পর্যাপ্ত পরিমাণে আলু বিদেশে রপ্তানি না হওয়ায় এবং বাজারে কৃত্রিম বা বাস্তব মন্দার কারণে এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে আলু বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা না হলে উত্তর জনপদের ঐতিহ্যবাহী এই খাতটি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং কৃষকরা আগামীতে আলু চাষে পুরোপুরি উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

০%
০%
০%
০%