রেকর্ড রাজস্ব ও পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের মধ্য দিয়ে নতুন উচ্চতায় মোংলা বন্দর

নাব্যতা উন্নয়ন, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজনের মাধ্যমে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরের কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত অর্থবছরে পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। খুলনার খালিশপুরের পোর্ট অডিটোরিয়ামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বন্দরের সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

খুলনায় অনুষ্ঠিত ওই মতবিনিময় সভায় বন্দর চেয়ারম্যান জানান, দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যেও মোংলা বন্দর অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ভূমিকা পালন করতে পারে। এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বর্তমানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং নৌপথের নাব্যতা বাড়াতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিগত অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ওই সময়ে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টন কার্গো এবং ২৯ হাজার ৭২৪ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। অথচ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ২৫ হাজার টিইইউএস হলেও অর্জিত হয়েছে ২৯ হাজার ৭২৪ টিইইউএস, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি, ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ, আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আয় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বা প্রায় ৪০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলোচ্য সময়ে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি বিদেশি জাহাজ ভিড়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, একই সময়ে ১২ হাজার ৭৫ ইউনিট রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি। বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখাকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, বর্তমানে জেটির সামনে ৭ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের সুবিধা রয়েছে। তবে চলমান ড্রেজিং কার্যক্রমের ফলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই তা ৯ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত হবে।

বন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি-৩) এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে বলে জানান বন্দর চেয়ারম্যান। এই প্রকল্পের আওতায় দুটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড, ডেলিভারি ইয়ার্ডসহ বহুমুখী সুবিধা গড়ে তোলা হবে এবং যুক্ত করা হবে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। এছাড়া, সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের মাধ্যমে দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংযোজনের কাজ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্যতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং সম্পন্ন হলে সরাসরি জেটি পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। এছাড়া বন্দর ব্যবহারকারীদের নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পারমিশন, ইকুইপমেন্ট বুকিং এবং বিল পরিশোধসহ যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। এমনকি ই-পেপার সার্ভিসের কাজও ইতিমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যেই এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে মোংলা বন্দরে কোনো ধরনের জাহাজজট নেই বলে দাবি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, কনটেইনারবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম মাত্র ১ দশমিক ৮০ দিন এবং অন্যান্য জাহাজের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৪৪ দিন। বর্তমানে বন্দরের ছয়টি কনটেইনার ইয়ার্ডে প্রায় ছয় হাজার টিইইউএস কনটেইনার সংরক্ষণের পাশাপাশি দুটি কার পার্কিং ইয়ার্ডে প্রায় দুই হাজার গাড়ি রাখার সুবিধা রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কমান্ডার এস এম আফজালুল ইসলাম, পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ, উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির এবং হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

০%
০%
০%
০%