সব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি একীভূত করতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেশের সকল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে একসূত্রে গেঁথে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের এই বার্ষিক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে তিনি সামাজিক সুরক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য নিরসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহার, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

ভাষণের শুরুতেই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল ভোটের গণতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না সরকার, বরং অর্থনীতির প্রকৃত গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল যেন দেশের প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, সেটির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি জানান যে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নানামুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সুনির্দিষ্ট সেবামূলক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইতোমধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কল্যাণে ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বিশেষায়িত সেবা চালু করা হয়েছে। এসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে আরও সংহত ও কার্যকর করতে ভবিষ্যতে একটি সর্বজনীন ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালাবর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানান তিনি।

বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ বিশ্ব গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। বিশ্ব বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োটেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করলেও প্রযুক্তির সুফল এখনো বৈশ্বিক পর্যায়ে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে উল্লেখ করে তিনি উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার জন্য সহজলভ্য করার ওপর জোর দেন। বর্তমানের ডিজিটাল বৈষম্য যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন কোনো বৈষম্যের জন্ম না দেয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে কোনো দেশই যেন পিছিয়ে না পড়ে। এআই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সুফল বিশ্ববাসীর মাঝে ইতিবাচকভাবে ছড়িয়ে দিতে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি সংকটের বিষয়টি বিশ্বমঞ্চে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর গভীর ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রোহিঙ্গা সংকটের শেকড় যেহেতু মিয়ানমারে প্রোথিত, তাই এর স্থায়ী সমাধানও সেই দেশেই নিহিত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়াকেই একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও দৃঢ়, সক্রিয় ও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও এর চড়া মূল্য এদেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলন থেকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। পরিবেশ সুরক্ষায় দেশের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও খরার মারাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

০%
০%
০%
০%