চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথে জলাবদ্ধতা রোধে আরও পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে সাতচল্লিশ কিলোমিটার লাইন

চালুর মাত্র তিন বছরের মাথায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে দফায় দফায় তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের স্থায়িত্ব বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার পানি থেকে এই কৌশলগত যোগাযোগ মাধ্যমকে রক্ষা করতে চট্টগ্রাম অংশের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ আরও পাঁচ ফুট উঁচু করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

গত জুলাই মাসে টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর থেকে জানআলীহাট অংশের শমসেরপাড়া এলাকায় রেললাইনের ওপর প্রায় ২১ ইঞ্চি পর্যন্ত পানি উঠে যায়। পানির প্রবল স্রোতে লাইনের নিচের পাথর বা ব্যালাস্ট সরে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে পাঁচ দিন পর্যন্ত এই রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে পর্যটক এক্সপ্রেসসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যদিও পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করে কিছু জায়গায় দেড় ফুট পর্যন্ত উঁচু করা হয়েছিল, তবুও এই ধরনের বিপর্যয় বারবার ঘটায় দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের তাগিদ অনুভূত হয়।

এর আগে ২০২৩ সালে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময়ও সাতকানিয়ার তেমুহুনি এলাকায় বন্যায় চার শতাধিক মিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে সময় প্রায় কুড়ি ফুট উঁচুতে এই রেলপথ নির্মাণ করা হলেও সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণে পুরোনো নকশা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ ছিল, অপরিকল্পিতভাবে রেললাইন নির্মাণের ফলে এলাকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে রেলওয়ে করণিক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বরাবরই এই অভিযোগ নাকচ করে আসলেও বর্তমান বাস্তবতায় নকশা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতার পর রেলওয়ে করণিক ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ৪৭ কিলোমিটার অংশ পাঁচ ফুট উঁচু করার এই নতুন পরিকল্পনার কথা জানান। ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য জলবায়ু পরিবর্তন ও পানির উচ্চতা আরও তিন ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও যাতে ট্রেন চলাচলে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, কোন নির্দিষ্ট ৪৭ কিলোমিটার অংশ উঁচু করা হবে তা নির্ধারণে আগামী মাসে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত জরিপ ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক জানিয়েছেন, পূর্বে ১০০ বছরের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের দ্রুতগতির কারণে এখন ১৫০ বছরের স্থায়িত্ব ও দূর্যোগের কথা বিবেচনা করে নকশা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এজন্য রেলওয়ের নকশা, ফিনিশড গ্রাউন্ড লেভেল এবং বন্যার পানির সর্বোচ্চ উচ্চতার তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর থেকে শুরু করে দোহাজারী, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া অংশের কোন কোন স্থানে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বা ছড়াগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে কালভার্ট ও ব্রিজগুলোর আকার ও অবস্থান পুনর্বিন্যাস করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল রেললাইনের ওপর পানি ওঠার বিষয়টিই নয়, বরং পানির তীব্র স্রোত কীভাবে লাইনের নিচের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। কেবল উচ্চতা বাড়ানোই নয়, বরং পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের সুচারু নিষ্কাশন নিশ্চিত করা না গেলে এই মেগা প্রকল্পের স্থায়ী সুফল পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

০%
০%
০%
০%