জলবায়ু সংকটের মুখে বৈশ্বিক সহায়তার জোরালো তাগিদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ার গতির চেয়ে আমাদের সংকল্প এবং পদক্ষেপ হতে হবে আরও দ্রুত ও ফলপ্রসূ।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ, যেখানকার শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে মিশেছে। দেশের মানুষের জীবন, সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লেই বাংলাদেশের প্রায় চার শতাংশ ভূখণ্ড চিরতরে পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং মৌলিক মানবাধিকার চরম হুমকির মুখে পড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই নির্মম বাস্তবতা একা মোকাবিলা করা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব যে মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ করে চলেছে, সাগর তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাই কেবল নিজস্ব সীমিত সম্পদ দিয়ে অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ চালিয়ে এই মহাবিপর্যয় রোধ করা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং উপকূল সুরক্ষায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে বলে তিনি জানান।

দেশের জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন করা হবে। পাশাপাশি, পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। এছাড়া সবুজ শিল্পায়ন, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, জাতীয় কার্বন বাজার গঠন এবং বন ও জলাভূমি সুরক্ষায় বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে চারটি সুনির্দিষ্ট ও জরুরি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথমত, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে কার্বন নিঃসরণ আরও দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় দেশের জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বৈশ্বিক ঐক্যের মাধ্যমে এমন একটি বিশ্ব গড়ে উঠবে, যেখানে সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান গ্রাসের মুখে কোনো দেশকে একা লড়াই করতে হবে না।

০%
০%
০%
০%