প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের দীর্ঘসূত্রিতা রোধে সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ ধরনের সীমাবদ্ধতা জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, কোনো ব্যক্তি সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করলে জনগণ যদি তাকে বারবার ক্ষমতায় দেখতে চায়, তবে তা রোধ করার কোনো সুযোগ নেই এবং এটি সরাসরি জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
মঙ্গলবার সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির দীর্ঘ বৈঠক শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে কিংবা অনাস্থার রাজনীতি বাদ দিয়ে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আলোচনায় অংশ নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানান।
বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জিত হলেও এর বাস্তবসম্মত কার্যকারিতা, রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দলীয়করণের শিকার হবেন কি না—সে বিষয়ে বিস্তারিত চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সংসদে উত্থাপিত হলে সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ পর্যালোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং এর রূপরেখা কোন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, জাতীয় সনদে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব ও ভিন্নমত রয়েছে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সংসদের নীতিনির্ধারণী আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি। এ ছাড়া বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, তা আলোচনার টেবিলে বসে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবিধান সংস্কারের এই প্রক্রিয়ায় দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও গুরুত্বপূর্ণ সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। বৈঠকে অংশ নিয়ে যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ বলেন, সংবিধান এমনভাবে সংশোধন করা উচিত যা দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে এবং বারবার রাজনৈতিক পালাবদলে যার পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও বিশ্লেষক ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার সুষম বণ্টন এবং নির্বাচনকালীন সরকারের স্থায়ী রূপরেখা তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংবিধান সংশোধনের এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় সমাজের সব স্তরের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে খুব শীঘ্রই সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী, নারী নেত্রী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রপথিক এবং বিভিন্ন শ্রমজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের পর্যায়ক্রমে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
উক্ত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মাহমুদুল হক রুবেলের পাশাপাশি আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর একরামুল হক সায়েম, সম্পাদক সোহরাব হাসানসহ সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।