ভোলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ: ঢাকা-চট্টগ্রাম ফেরত রোগীদের ভিড়ে সংকটে দরিদ্র পরিবার

ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এখন চলছে এক কঠিন বাস্তবতার লড়াই। গত কয়েকদিনে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মিরাজ, মোজাম্মেল বেপারী ও ডাব ব্যবসায়ী মো. হোসেনের মতো বহু মানুষ। চলতি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও দ্বীপ জেলা ভোলায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে রোগীর স্বজনরা। হাসপাতালের বেডে শয্যাষায়ী প্রিয়জনদের রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং শারীরিক অবস্থার অবনতিতে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পরিবারগুলোর।

ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়ন থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রাজমিস্ত্রি মিরাজের মা রিজিয়া বেগম ছেলের শয্যাপাশে থেকে নিজেই যেন প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, চট্টগ্রামে কাজের সন্ধানে যাওয়ার পর গত কয়েকদিন আগে তীব্র জ্বর ও বমি নিয়ে বাড়িতে ফেরেন মিরাজ। পরে রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেট আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই রকম সংকটে পড়েছেন চট্টগ্রাম ফেরত বৃদ্ধ মোজ্জাম্মেল বেপারীও। তার মেয়ে আকলিমা বেগম জানান, সম্প্রতি বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে এবং রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে তাকে ভোলা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। তবে আকস্মিক এই ধাক্কায় চরম আর্থিক অনটনে পড়েছেন তারা। অন্যদিকে, ঢাকায় ডাব বিক্রেতা মো. হোসেনও হুট করে অসুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আক্রান্তদের তালিকা থেকে বাদ যায়নি ১০ মাসের শিশু থেকে শুরু করে মাদরাসাছাত্ররাও। ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০ মাসের শিশু রাফির মা লাইজু আক্তার উদ্বেগের সুরে জানান, রাতে নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পরও তার শিশু সন্তান ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষা পায়নি। গত তিন দিন ধরে টানা জ্বরে ভোগার পর হাসপাতালে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ভোলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দ্বীপ জেলাটিতে পৌনে সাতশ ডেঙ্গু রোগী স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিনশ রোগী। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তৎপরতার কথা জানিয়ে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরাফাতুর রহমান জানান, হাসপাতালে প্রতিদিনই নতুন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন, যাদের সিংহভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আক্রান্ত হয়ে ফিরেছেন। ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে জানিয়ে তিনি জনসাধারণকে অতিরিক্ত জ্বর ও শরীর ব্যথা দেখা দিলে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেন এবং আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানান।

ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মু. মনিরুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মশক নিধন কর্মসূচি চলমান থাকায় বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলার তুলনায় ভোলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জ্বর বা ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা মাত্রই স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।

০%
০%
০%
০%