উত্তম খাদ্যাভ্যাস তৈরি না হওয়ায় অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার বাড়ছে

অস্বাভাবিক জীবনধারা ও পুষ্টিহীন খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাদ্যাভ্যাসের এই চিত্র তুলে ধরা হয়। ‘রংপুর জেলার মানুষের খাদ্য বৈচিত্র্যতা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট (বারটান)।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বারটান রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ছাদেকুল ইসলাম। তিনি জানান, ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট মৃত্যুর ৭০ ভাগই ঘটছে হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, মানসিক সমস্যা ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগে। বর্তমানে দেশে ৫২ শতাংশ পুরুষ ধূমপায়ী এবং প্রতি পাঁচজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ২০২১ সালের উপাত্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই বছর দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩১ লাখের বেশি এবং এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ হাজার ৬১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রংপুর অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের চিত্র তুলে ধরে ড. ছাদেকুল জানান, স্থানীয় মানুষের খাদ্য তালিকার ৬৭ শতাংশজুড়েই থাকে দানাদার খাবার। যেখানে একজন ব্যক্তির প্রতিদিন ৫ গ্রাম লবণ খাওয়ার কথা, সেখানে খাওয়া হচ্ছে ১১ গ্রাম। চিনির ক্ষেত্রেও দৈনিক ২০ গ্রামের নির্ধারিত সীমার বিপরীতে ৫ গ্রাম এবং ৪০০ গ্রাম শাকসবজি ও ফলমূলের পরিবর্তে খাওয়া হচ্ছে ৩১৭ গ্রাম। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, জেলার শতভাগ মানুষ নিরাপদ উৎস থেকে পানি পান করছেন, ৬০ শতাংশ মানুষের উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে এবং ৯৬ শতাংশ পরিবারের হাত ধোয়ার স্থানে পানি ও সাবান নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ৫৯ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে।

অতিরিক্ত লবণ ও অপর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করে সেমিনারে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়ছে। এছাড়া ফলমূলের স্বল্পতার কারণে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বাদাম, বীজ, শাকসবজি এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ আঁশযুক্ত খাবারের ঘাটতিকে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ডায়েটসংক্রান্ত ১ কোটি ১০ লাখ মৃত্যুর মধ্যে ১ কোটি ঘটেই হৃদরোগের কারণে, যা মানুষের গড় আয়ু প্রতি পাঁচজনে এক বছর করে কমিয়ে দিচ্ছে।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের অন্তরায় ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে জানানো হয়, দেশে রোগ সম্পর্কিত পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকায় সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না এবং ৬০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালেও রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া ১৫২টি আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ২৪-২৫ অর্থবছরে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যই অনিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে।

বারটানের প্রধান কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা। সেমিনারে কৃষি, খাদ্য, পুষ্টি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ৫০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও ভেজালবিরোধী অভিযানের ওপর জোর দেন।

০%
০%
০%
০%