পটুয়াখালীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ, হাসপাতালে বাড়ছে রোগী

পটুয়াখালীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সর্বশেষ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ৩৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বর্তমানে জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মোট ১১০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৬০৮ জন এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি অর্থাৎ প্রায় ৯০০ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোগীর অতিরিক্ত চাপে হাসপাতালের শয্যা তো বটেই, মেঝে, বারান্দা এমনকি চলাচলের পথেও রোগীদের মাদুর পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রায় ৩০ জন। অতিরিক্ত এই রোগীর চাপে চিকিৎসক ও নার্সরাও চরম হিমশিম খাচ্ছেন। পটুয়াখালী সদর থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্য সরোয়ার হোসেন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডের সামনের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে মহিলা ওয়ার্ডেও। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসা সাহানারা বেগম সিট না পেয়ে দোতলার মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের যাতায়াতের পথের পাশে অন্য রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রচণ্ড গরম ও মশার উপদ্রবের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের রোগী একসঙ্গে থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

হাসপাতালের এমন নাজুক পরিস্থিতির বিষয়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা জানান, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ৯০০ থেকে ১ হাজার রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসক ও কর্মীদের পক্ষে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। এদিকে, ডেঙ্গুর নানা উপসর্গ ও রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো স্পষ্ট লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগীর পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসায় জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ ও প্রবীণ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এফ এম আতিকুর রহমান জানান, টেস্টে নেগেটিভ এলেই ডেঙ্গু হয়নি বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। বিশেষ করে উপসর্গ প্রকাশের কয়েক দিন পর টেস্ট করালে অনেক সময় ‘এনএস ওয়ান’সহ বিভিন্ন রিপোর্ট নেগেটিভ আসতে পারে। তাই শুধু রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে রোগীর ক্লিনিক্যাল হিস্ট্রি, তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর বা পেটে ব্যথা, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম কিংবা চরম দুর্বলতার মতো লক্ষণগুলো বিবেচনা করে চিকিৎসা দিতে হবে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে বাড়িতে বসে না থেকে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া। তিনি বলেন, বরাবরের তুলনায় বর্তমানে জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা বেশি। সিভিল সার্জন অফিসের উদ্যোগে সচেতনতামূলক সভা আয়োজনের পাশাপাশি মশা নিধনে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে পুরোপুরি ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ বাসাবাড়ী ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার এবং কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

০%
০%
০%
০%