রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে রোগীদের চাপ বেড়েই চলেছে, কিন্তু গত প্রায় এক বছর ধরে দুটি ক্যাথল্যাবের মধ্যে একটি অচল থাকায় পুরো চিকিৎসা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিরুপায় হয়ে চিকিৎসকদের এখন একটিমাত্র সচল ক্যাথল্যাবের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হচ্ছে। এমন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গত এক মাসে এই ল্যাবে ১১০টি এনজিওগ্রাম, ২০টি রিং বা করোনারি স্টেন্ট এবং সাতটি পেসমেকার সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ক্যাথল্যাবের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে এর আয়ুষ্কাল অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এনজিওগ্রাম, রিং ও পেসমেকার স্থাপনের জন্য সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত এনজিওগ্রাম এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার রিং ও পেসমেকার স্থাপনের কাজ করা হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের কাক্সিক্ষত সেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে। উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তির এই ক্যাথল্যাবের মাধ্যমেই হৃদরোগীদের রক্তনালির ব্লক শনাক্তকরণসহ জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা দেওয়া হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. হাসানুল ইসলাম জানান, উত্তরাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক রোগী অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। তাদের এনজিওগ্রামে ব্লক ধরা পড়লেও রিং স্থাপনের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় রিংসহ অন্যান্য জরুরি উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা যেত, তবে দরিদ্র হৃদরোগীরা ব্যাপক উপকৃত হতেন। পাশাপাশি তিনি রমেক হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ না থাকাকে বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কোনো রোগীর বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হলে তাকে বাধ্য হয়ে ঢাকায় ছুটতে হয়, যা নিম্নবিত্ত রোগীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি ও ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা খরচ অনেকটা কম। নীলফামারীর বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেনের স্বজন নাসির হোসেন জানান, সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে এনজিওগ্রামের সুবিধা পাওয়ায় তারা উপকৃত হয়েছেন। তবে কার্ডিয়াক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে গিয়ে অনেককে বাড়তি হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে পীরগঞ্জের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের মতো অনেককে রিং স্থাপনের জন্য বড় অংকের ব্যয় বহন করতে হয়েছে, যা সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে আরও সহনীয় পর্যায়ে থাকত।
ক্যাথল্যাব ইনচার্জ ও টেকনোলজিস্ট মাহমুদুল হাসান জানান, বর্তমানে সচল মেশিনটির ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ছে। মাঝেমধ্যে কারিগরি ত্রুটি বা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি এসির কেবলসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় বেশ কয়েকদিন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল, যা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে। রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আশিকুর রহমান জানান, বর্তমানে হাসপাতাল চত্বরে ১৫ তলাবিশিষ্ট যে ৪৬০ শয্যার সমন্বিত ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ ইউনিট নির্মাণাধীন রয়েছে, তার কাজ আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। সেই নতুন ইউনিটে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ নতুন ক্যাথল্যাব সংযোজিত হবে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় বর্তমানে পুরোনো ল্যাব মেরামতে বা নতুন মেশিন ক্রয়ে বড় কোনো বিনিয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে রোগীদের চিকিৎসা সংকট কাটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে।