রাজবাড়ীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৮ জন, যা সেপ্টেম্বর মাসে এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৯ জনে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৯১ জন বা প্রায় ১৩৪ শতাংশ।
চলতি বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুন মাসে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭ জন, জুলাইয়ে ২২ জন, আগস্টে ৬৮ জন এবং সেপ্টেম্বর মাসে তা লাফিয়ে ১৫৯ জনে পৌঁছায়। এ নিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২৭১ জনে। এর আগে গত বছর ২০২৫ সালে রাজবাড়ীতে মোট ৪১৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। এদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ছয়জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বর্তমানে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে চারজন, পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন, কালুখালীতে একজন, বালিয়াকান্দিতে পাঁচজন এবং গোয়ালন্দে দুজন রোগী ভর্তি আছেন।
বর্ষা মৌসুমের শেষভাগজুড়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় এডিস মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ স্পষ্টতই বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে রাজবাড়ী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই চিকিৎসাধীন থাকতে দেখা গেছে। সেখানে ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় মশারি টাঙানোর কোনো বালাই লক্ষ্য করা যায়নি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাজেল পাঠানের ভাই মামুন পাঠান জানান, ঢাকায় চাকরি করার সুবাদে সেখানেই তাঁর ভাই জ্বরে আক্রান্ত হন এবং তীব্র জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরার পর হাসপাতালে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। কিন্তু ওয়ার্ডে মশারির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, রাজবাড়ী পৌর এলাকায় মশার উপদ্রব মারাত্মক আকার ধারণ করায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। সন্ধ্যার পর থেকে মশার উৎপাতে টিকতে না পারলেও পৌরসভার মশক নিধন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। পৌরসভার নিজস্ব আটটি ফগার মেশিনের মধ্যে বর্তমানে ছয়টিই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত কোনো মশক নিধন অভিযান না থাকায় শহরের অলিগলি, ড্রেন, নালা ও ঝোপঝাড়ে মশার নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজবাড়ী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. বেলায়েত হোসেন জানান, বর্তমানে হাসপাতালে চারজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন এবং গত মাসে ৫৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। সৌভাগ্যবশত এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে রোগীদের নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ভাইরাসজনিত জ্বর হওয়ায় এর সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, বরং রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝে সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বিষয়ে রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক কল্যাণ চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্দেশনার আলোকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পৌরসভার সচল থাকা দুটি ফগার মেশিনের মাধ্যমে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার না রাখলে এবং পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা ও জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে মশার বংশবিস্তার রোধ করা না গেলে আগামী দিনে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।