সাগরে নিখোঁজ ১১ জেলে নয় মাস পেরিয়েও ফেরেনি স্বজনরা

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি থেকে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ নয় মাস পেরিয়ে গেলেও মেলেনি ১১ জেলের কোনো সন্ধান। লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম—এই চার জেলার ১১ জন জেলের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্বজনরা। তাদের জীবিত ফেরার আশায় প্রহর গুনছে পরিবারগুলো, অথচ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ায় বাড়ছে হতাশা।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর। চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট থেকে ‘এফবি শরিফা-২’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন আলমগীর মাঝিসহ ১১ জেলে। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ জেলেদের তালিকায় রয়েছেন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার সুজন গ্রামের আলমগীর মাঝি, চর গজারিয়া গ্রামের মামুন মিস্ত্রি ও সবুজ গ্রামের তছির আহমেদ। এছাড়া নোয়াখালীর চারজন, কুমিল্লার দুজন এবং চট্টগ্রামের দুজন জেলে রয়েছেন এই তালিকায়।

নিখোঁজ আলমগীর মাঝির মেয়ে জেসমিন বেগম জানান, তার বাবা ট্রলারে যাওয়ার আগে মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। ট্রলারটি ছেড়ে দিতে চাইলেও তাকে ফোনে হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক সাগরে পাঠানো হয়েছিল। সাগরে যাওয়ার পর থেকে ট্রলারটির কোনো হদিস নেই, নেই জেলেদের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কোনো সংকেত। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করা হলেও তদন্তের গতি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রলার মালিক মাইন উদ্দিন নাহিদ, নুরুল ইসলাম রাসেল, মোহাম্মদ বেলাল ও কামাল মেম্বারসহ সংশ্লিষ্টরা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেননি। উল্টো আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে নিখোঁজ জেলেদের বিরুদ্ধেই ট্রলার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মিথ্যা মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—ট্রলারটি মাছ ধরার পাশাপাশি চট্টগ্রামের রিয়াজ উদ্দিন বাজারের ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ২৫০ বস্তা সিমেন্ট ও ময়দা নিয়ে মিয়ানমারের দিকে গিয়েছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা এক জেলের জবানবন্দিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, নিখোঁজ জেলেদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকায় আরাকান আর্মি আটক করে রাখতে পারে। এই জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার তদন্তে ট্রলার মালিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত। তবে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত মো. রাসেল এখনো পলাতক রয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্ন নিয়ে’-এর সহায়তায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিজিবি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেও তারা কোনো কার্যকর সাড়া পায়নি। নিখোঁজ জেলেদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পরিবারগুলো এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সরকারি সহযোগিতা কামনা করছে।

দীর্ঘ নয় মাস ধরে স্বজনহারা পরিবারগুলো অনিশ্চিত অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেছেন, তাদের প্রিয়জনরা জীবিত না মৃত—অন্তত সেই সত্যটুকু তারা জানতে চান। দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

০%
০%
০%
০%