রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার জনবহুল রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় কোনো সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে কাউকেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে এই স্পর্শকাতর ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতি প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শনিবার বিকেলে আকস্মিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি জনবহুল এলাকায় এত বড় মাপের তাণ্ডব ও ভাঙচুর অল্প সময়ের মধ্যে সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। প্রাথমিক পরিদর্শনে টিনের শেডসহ ভবনের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ভাঙচুরের চিহ্ন পাওয়ার পাশাপাশি ল্যাবের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি উধাও হয়ে যাওয়ার সত্যতাও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে প্রায় আড়াই শ মুখোশধারী দুর্বৃত্ত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আকস্মিক হানা দেয়। এ সময় হামলাকারীরা দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনে তান্ডব চালায় এবং পরবর্তীতে সেখানে একটি দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে কেন্দ্রটি জবরদখল করে নেয়।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকাদান সামগ্রী, রেজিস্টার, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সরঞ্জাম, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। এছাড়া জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ, সিসিটিভি ক্যামেরা, ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম এবং কম্পিউটারসহ নানা মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে মিরপুরের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি আক্রান্ত হওয়ায় বর্তমানে রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও সম্পূর্ণরূপে থমকে গেছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌসী মিষ্টির বিরুদ্ধে জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার জানান, ইতিমধ্যে শাহ আলী থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এজাহারনামীয় প্রধান আসামিসহ অজ্ঞাতনামা দুই থেকে আড়াই শ দুর্বৃত্তকে আইনের আওতায় আনতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধপ্রবণতার এই ঘটনায় কোনো দল, মত বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি।
এদিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে তাণ্ডব প্রতিহত করতে না পারার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে যে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তা আমলে নিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। এই ঘটনার নেপথ্যে পুলিশের কোনো পূর্বতথ্য ছিল কি না, কিংবা দেরিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পেছনে কোনো প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বা অবহেলা ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখতে দারুসসালাম জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারের (এডিসি) নেতৃত্বে ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দেশজুড়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বর্তমান সরকার কোনো ধরনের দখলদারত্ব, বেআইনি কর্মকাণ্ড বা অপরাধমূলক তৎপরতা বরদাশত করবে না উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। অবিলম্বে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত সব হোতাকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পুনরায় চালুর জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ।