বিশ্বের মানচিত্রের বিকৃতি দূর করতে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন গ্রহণের আহ্বান জাতিসংঘের

বিশ্বজুড়ে মানচিত্রের প্রচলিত ধারণা ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে জাতিসংঘ। দীর্ঘ চার শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রে মহাদেশগুলোর আয়তন নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও বিকৃতি বিদ্যমান, তা নিরসনে সাধারণ পরিষদ ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন গ্রহণের পক্ষে ১৬৪-১ ভোটে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। টোগোর নেতৃত্বে আফ্রিকান ইউনিয়নের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বিষুবরেখার নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোর প্রকৃত আয়তন বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।

মারকেটর প্রজেকশনের ত্রুটির কারণে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমতুল্য মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নৌ-বাণিজ্যের সুবিধার্থে তৈরি এই মানচিত্রে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে অতিরঞ্জিতভাবে বড় করে দেখানো হয়, যা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ভৌগোলিক গুরুত্বকে সংকুচিত করে রাখে। নতুন এই প্রস্তাবের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে মানচিত্রের এই বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘের এই ঐতিহাসিক ভোটাভুটিতে একমাত্র দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে। মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ এই উদ্যোগকে ‘চরমপন্থী আদর্শিক প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি বিশ্ব সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া সার্বিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেন এই ভোটাভুটি থেকে বিরত ছিল।

এই প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক না হলেও এটি বিশ্বব্যাপী মানচিত্রের প্রচলিত ধারায় এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি স্পষ্ট করেছেন যে, মানচিত্র কেবল কাগজ নয়, বরং এটি মানুষের শিক্ষা ও সম্মিলিত উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। আগামী বছর লোমে শহরে ইউনেস্কো ও গুগলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে একটি বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে এই নতুন প্রজেকশন বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে।

পৃথিবী গোলকাকার হওয়ায় কোনো সমতল মানচিত্রই শতভাগ নির্ভুল হতে পারে না, কারণ আয়তন ঠিক রাখতে গেলে আকৃতি বা দূরত্বের বিকৃতি ঘটে। ১৫৬৯ সালে জেরার্ডাস মারকেটর নৌ-চলাচলের সুবিধার্থে যে প্রজেকশন তৈরি করেছিলেন, তা দীর্ঘ ৫০০ বছর ধরে বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন ও অনুপাত প্রদর্শনের মাধ্যমে এক নতুন বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করতে চায়।

০%
০%
০%
০%