ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক পুরাতন কালীবাড়ি মন্দির থেকে চুরি হওয়া প্রায় এক কোটি টাকার অমূল্য কষ্টিপাথরের কালী প্রতিমা ও বহুমূল্যবান অলংকার উদ্ধার করেছে পুলিশ। দীর্ঘ সাতদিনের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান ও তথ্যপ্রযুক্তির নিপুণ ব্যবহারে এই চাঞ্চল্যকর চুরির রহস্য উদঘাটন করা হয়। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে কুখ্যাত চোর চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে।
রোববার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার শাহরীয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী এই সফল অভিযানের বিস্তারিত গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত গভীর রাতে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের পশ্চিম পাশে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন এই মন্দিরে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। অপরাধীরা মন্দিরের একটি কাঠের ও একটি লোহার গেটের মোট পাঁচটি তালা ভেঙে প্রবেশ করে কষ্টিপাথরের কালী প্রতিমাসহ বিপুল পরিমাণ ধর্মীয় সামগ্রী ও অলংকার লুট করে নিয়ে যায়। ১৯০৩ সালে নির্মিত ১৮ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই প্রাচীন মন্দিরে এমন ন্যাক্কারজনক চুরির ঘটনায় সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায় ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল।
ঘটনার পরপরই মন্দির কমিটির সভাপতি কুশল চক্রবর্তী বাদী হয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি নিয়মিত চুরির মামলা দায়ের করেন। মামলার পর থেকেই নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জেলা পুলিশের নিবিড় ছায়া তদন্ত, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার জেলার বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুরাইচ ইউনিয়নের বুরাইচ গ্রাম থেকে আসাদুজ্জামান সাদ্দাম (৩৮) ও তার মা সাজেদা বেগমকে (৬৫) এবং বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নের কান্দাকূল গ্রাম থেকে আমিন মোল্লাকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সাজেদা বেগমের বসতবাড়ির রান্নাঘরের মাটির নিচে পুতে রাখা অবস্থায় চুরি যাওয়া স্বর্ণ ও রুপার অলংকার এবং মন্দিরের ছয়টি পিতলের মূর্তি উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে সাদ্দাম ও আমিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বোয়ালমারী উপজেলার রূপপাত ইউনিয়নের রূপপাত গ্রামের মাসুদ মোল্লার বসতবাড়ির পেছনের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় প্রায় ২০ কেজি ওজনের অমূল্য কষ্টিপাথরের কালী প্রতিমাটি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। তদন্তের অগ্রগতির এক পর্যায়ে রোববার সকালে বোয়ালমারী স্বর্ণ বাজারের একটি জুয়েলার্সে অভিযান চালিয়ে প্রতিমার গলানো স্বর্ণালংকার এবং কানের দুল ও টিকলি উদ্ধার করা হয়। এ সময় চুরির সোনা কেনার অপরাধে ওই জুয়েলার্সের মালিক আতিয়ার রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত প্রধান অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান সাদ্দামের বিরুদ্ধে ফরিদপুরের বিভিন্ন আদালতে চুরি, দস্যুতা, ডাকাতি ও মূর্তি চুরির অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। এছাড়া আমিন মোল্লার বিরুদ্ধেও একই ধরনের অপরাধে আটটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে প্রায় এক কোটি টাকার কষ্টিপাথরের কালী প্রতিমা, প্রায় পাঁচ ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার, আট কেজি ওজনের বিষ্ণু, রাধাকৃষ্ণ ও মনসা মূর্তি এবং ত্রিশ ভরি রুপাসহ মোট এক কোটি ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকার মালামাল।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হিরামন বিশ্বাস জানান, গ্রেপ্তারকৃত চার আসামিকে রোববার বিকেলে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এদিকে প্রাচীন এই মন্দিরে পবিত্র প্রতিমা ও অলংকার চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকী অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও মন্দির কমিটির নেতারা।