রংপুরে সরকারি ১১৫ অফিসের বড় অংশে নেই তথ্য হালনাগাদ

রংপুরে জেলা তথ্য বাতায়নের অন্তর্ভুক্ত ১১৫টি সরকারি অফিসের মধ্যে মাত্র ১৪টি অফিসের ওয়েবসাইটে শতভাগ তথ্য হালনাগাদ রয়েছে। বাকি অফিসগুলোর বড় একটি অংশে তথ্যের গুরুতর ঘাটতি এবং কোনো কোনোটিতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তার চিত্র উঠে এসেছে, যা সরকারি সেবাখাতে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল ট্রান্সপারেন্সির কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষ্যে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ করা হয়। জেলা প্রশাসন, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। চলতি বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ; অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’।

অনুষ্ঠানে টিআইবি রংপুর অফিসের এরিয়া কো-অর্ডিনেটর মো. আলমগীর কবির তথ্য অধিকার আইন ও জেলার সরকারি অফিসগুলোর ওয়েবসাইট হালনাগাদ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। গত ১৩ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার ১১৫টি সরকারি অফিসের ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। নোটিশ বোর্ড, অফিস প্রধানের তথ্য, সিটিজেন চার্টার, যোগাযোগ, খবর, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা (ডিও)—এই ক্যাটাগরিগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, ১১৫টি অফিসের মধ্যে ৩৩টিতে ৮৬ শতাংশ তথ্য রয়েছে, ৩২টিতে ৭১ শতাংশ (আংশিক ঘাটতি), ২২টিতে ৫৭ শতাংশ (মধ্যম ঘাটতি), ১২টিতে ৫০ শতাংশ তথ্য হালনাগাদ রয়েছে এবং ৩টি অফিসের ওয়েবসাইট সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।

উপস্থাপিত তথ্যে আরও জানানো হয়, গত বছরের তুলনায় এ বছর কিছু খাতে অগ্রগতি হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে তথ্য হালনাগাদের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালে ওয়েবসাইটের নোটিশ বোর্ড হালনাগাদের হার ৬৮ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ কমে বর্তমানে ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া খবরের ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৭ শতাংশ। তবে অফিস প্রধানের তথ্য ১৬ শতাংশ বেড়ে ১০৮ শতাংশ, সিটিজেন চার্টার ৮ শতাংশ বেড়ে ১০১ শতাংশ এবং যোগাযোগ তথ্য ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০২ শতাংশ হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য গত বছরের মতো ১০৯ শতাংশ অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার তথ্য ১৯ শতাংশ বেড়ে ৭৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

সরকারি সেবাখাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই পর্যবেক্ষণ চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন টিআইবির প্রতিনিধি। তিনি জানান, সংগৃহীত সব তথ্য জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে, যাতে জনসাধারণের তথ্য জানার অধিকার সুগম হয় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি হ্রাস পায়।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতা ও অপব্যবহারের ফলে অপতথ্য এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। এই সংকট উত্তরণে বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ এখনো তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, তাই এই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বশীলতার ওপর জোর দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সঠিক ও নির্ভুল তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরাই গণমাধ্যমের মূল কাজ। যেকোনো সংবাদ পরিবেশনের আগে তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায়। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব বা অপতথ্য ছড়ালে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সকল দপ্তরের ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ রাখার কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়া বিগত নয় মাসে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর আওতায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪টি আবেদন জমা হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।

আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রমিজ আলম, আঞ্চলিক তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. শাহজাহান আলী, সনাক রংপুরের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট দিলরুবা জামান ও সিদ্দিকুর রহমান এবং রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক। বক্তারা ডিজিটাল যুগে সরকারি তথ্য জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং অপতথ্য রোধে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দেন।

০%
০%
০%
০%