ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন দেশটির আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে প্রধান দুটি আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক জোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। আগামী মাসের এই নির্বাচনে এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকরা ইসরায়েলি সংসদে অর্থাৎ নেসেটে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। ডানপন্থী দলগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের এই বিতর্কিত ভোটাভুটিতে আরব-ইহুদি হাদাশ দলের ইহুদি রাজনীতিবিদ ওফের কাসিফ এবং ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী বালাদ দলের নেতা সামি আবু শেহাদেহকেও প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান ১২০ আসনের নেসেটে হাদাশ-তাল জোটের পাঁচটি আসন রয়েছে এবং এর মধ্যে হাদাশের তিন ও তালের দুই জন রাজনীতিবিদ দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত রা'আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট নামক দলটি আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং বর্তমান সংসদে তাদেরও পাঁচটি আসন রয়েছে। এই দলগুলোর প্রধান ভিত্তি হলো ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক।
ডানপন্থী রাজনৈতিক দল লিকুদ এবং ওতজমা ইয়েহুদি কর্তৃক দাখিল করা একাধিক আবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এসব আবেদনে আরব দল ও প্রার্থীরা ইসরায়েলের ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বকে অস্বীকার করছেন, সশস্ত্র সংঘাতে সমর্থন যোগাচ্ছেন এবং বর্ণবাদে উসকানি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আনা হয়। সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির সভাপতিত্বে পরিচালিত এই কমিটিতে বিদায়ী নেসেটের বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা ভোটাভুটিতে অংশ নেন, যার ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার এই প্রক্রিয়ায় দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ জোরালো হয়েছে।
আইনগত পর্যালোচকের ভূমিকায় ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারভ-মিয়ারা দুটি আরব জোট এবং কাসিফের অযোগ্যতা ঘোষণার তীব্র বিরোধিতা করে জানান যে, উপস্থাপিত প্রমাণগুলো আইনি মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বালাদ নেতা সামি আবু শেহাদেহর ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন, যার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের হামলার পর প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ওই ঘটনাকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালাহ নামক ফিলিস্তিনি আইনি অধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রা'আম ও যৌথ তালিকা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ১৮-৫ ভোটে প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং কাসিফ ও আবু শেহাদেহর ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৮-৫ ও ৩১-৪ ভোটে নিষেধাজ্ঞা অনুমোদিত হয়েছে।
অবশ্য এই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই শেষ কথা নয় এবং আগামী সপ্তাহে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এই পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অতীতে সুপ্রিম কোর্ট আরব দল ও প্রার্থীদের বহিষ্কারের পূর্ববর্তী উদ্যোগগুলোকে বহুবার বাতিল করেছে, যা এবারও পুনরাবৃত্ত হতে পারে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতে, চরমপন্থী মন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে বহাল রেখে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বশীল দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার এই প্রচেষ্টা ইসরায়েলি গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।