টেকনাফে মিয়ানমারে সার পাচার ও কৃত্রিম সংকটে বিপাকে আমন কৃষকরা

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে সার পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারসহ খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভরা আমন মৌসুমে সার না পেয়ে কৃষকরা বগলে বস্তা নিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। এতে কৃষকদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস হলো জমিতে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। চলতি আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণের পর থেকে টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকদের অনেকে পূর্বে জমিতে সার প্রয়োগ করলেও তা বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে। ফলে সকল ধানি জমিতে পুনরায় সার প্রয়োগের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।

সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রির নির্দেশনা রয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে বর্তমানে ইউরিয়া ও টিএসপি ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। কৃষি অফিসের নির্দেশনার কথা বলে ডিলাররা বস্তার মুখ কেটে সার বিক্রি করছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিলারদের হাত ঘুরে বিভিন্নভাবে এই সার পাচারকারীদের মাধ্যমে মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে। কোস্ট গার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত পয়েন্ট থেকে বেশ কয়েকবার সারের চালান জব্দ করেছে। সম্প্রতি বিজিবি ১০ থেকে ২০ কেজির ছোট বস্তায় সার ভরে তা পুনরায় সেলাই করে পাচারকালে হাতেনাতে জব্দ করে। এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসা কৃষি বিভাগ সার পাচার রোধে এবং বিতরণে কঠোর মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হ্‌ণীলা, হোয়াইক্যং এই দুই ইউনিয়নে কিছুটা সংকট থাকলেও উপজেলার অন্যান্য স্থানে সারের ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। টেকনাফের জন্য ইতোমধ্যে ৭০ টন অতিরিক্ত সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে তা পাওয়া গেলে সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে হ্নীলার পানখালীর কৃষক খলিল আহমদ, হোয়াব্রাংয়ের সরোয়ার আলম ও হোছন, মরিচ্যাঘোনার জহির বৈদ্য, ছোট লেচুয়াপ্রাংয়ের সিরাজ মিয়া, কম্বনিয়াপাড়ার আব্দুস শুক্কুর ও নুরুন্নাহার, উনছিপ্রাং রইক্ষ্যংয়ের আব্দু শুক্কুর, পুটিবনিয়ার কিউ চিং চা চাকমা, কাঞ্জরপাড়ার কামাল উদ্দিন বাচ্চু এবং লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজের শাহ আলমসহ অনেক কৃষক জানিয়েছেন যে, তারা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ সার পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বেশি দামে বা মাত্র ১০ থেকে ১৫ কেজি সার পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এবং সার না পেয়ে জমি পরিত্যক্ত রাখার কথাও জানিয়েছেন। কিউ চিং চা চাকমা বাধ্য হয়ে স্থানীয়ভাবে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে সার কিনেছেন।

উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম ওসমানগনী অভিযোগ করেছেন যে, টেকনাফের প্রকৃত কৃষকরা সময়মতো সার না পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে হাহাকার চলছে। ডিলাররা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করে তিনি মিয়ানমারে সার পাচারে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সার সংকটের বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। ডিলারদের নিয়ে বৈঠক করে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তবে কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি এস এম অনীক চৌধুরী সার সংকটের বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেছেন। তিনি জানান, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ১১০ হেক্টর লবণ মাঠে ধানের আবাদ বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ৭০ টন ইউরিয়া সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে, যা আগামী সপ্তাহে পাওয়া গেলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। স্থানীয় কৃষকরা দ্রুত এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে ন্যায্যমূল্যে পর্যাপ্ত সার সরবরাহের মাধ্যমে অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

০%
০%
০%
০%