মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী তাঁতশিল্প আজ নানা প্রতিকূলতার মুখে হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময়ে যে তাঁতপল্লীগুলো কাঠের মেশিনের খটখট শব্দে মুখর থাকত, বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে সেগুলোতে নেমে এসেছে গভীর নিস্তব্ধতা। সুতা, কাঁচামাল ও রঙের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা।
উপজেলার সর্ববৃহৎ কর্মধার ইউনিয়নের লংলা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ভান্ডারীগাঁও, ফটিগুলি ও নলডরী গ্রামে মনিপুরী সম্প্রদায়ের পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু বসবাস করেন। আড়াই যুগ আগেও এই তিনটি গ্রামে দেড় শতাধিক তাঁতপল্লি সজীব ছিল। তিন শতাধিকেরও বেশি মনিপুরী নারী-পুরুষ এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। তখন এই পল্লীগুলোতে উৎপাদিত শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদর দেশ পেরিয়ে বিদেশেও চলে যেত। বিভিন্ন বায়িং হাউজ এসব সামগ্রী কিনে নিয়ে যেত এবং সে সময় সুতা ও কাঁচামালের দাম কম থাকায় কারিগরদের ভালো আয় হতো।
বর্তমানে সরেজমিনে কুলাউড়ার মনিপুরী তাঁতপল্লিতে দেখা যায়, মাত্র ১৫ থেকে ২০টি কাঠের তৈরি তাঁত মেশিনে সনাতনী পদ্ধতিতে কেবল নিজেদের ব্যবহারের জন্য শাড়ি, কাপড়, গামছা ও ওড়না তৈরি করছেন মনিপুরী রমণীরা। ভান্ডারীগাঁও গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা পুষ্পিতা এবং শিউলী দেবী জানান, বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গামছা তৈরির ক্ষেত্রে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সনাতনী পদ্ধতিতে রঙিন মোটিফসহ একটি শাড়ি তৈরি করতে দুই দিন সময় লাগে এবং মজুরিসহ একটি শাড়ি তৈরিতে ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হলেও বাজারে তা ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। সুতাসহ কাঁচামালের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এবং সামান্য লাভে পোষাতে না পেরে অনেক পরিবার এই কাজ ছেড়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরি, কৃষি ও অন্যান্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সরকারি চাকরিজীবী প্রদীপ সিং বলেন, মনিপুরী তাঁতশিল্প আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহু পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকলেও নানা প্রতিকূলতার কারণে এটি আজ বিলুপ্তির পথে। ফটিগুলি গ্রামের জিহারি সিংহ, নলডরী গ্রামের দিলীপ কুমার সিংহ, ভান্ডারীগাঁও গ্রামের সুরঞ্জিত সিংহ ও গৌর চন্দ্র সিংহ জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ক্ষুদ্রঋণের অভাবের কারণে তাঁতিরা এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। তবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসে তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।