আইভরি কোস্টে মানবপাচার চক্রের হাতে রংপুরের সানোয়ার নিহত মরদেহ ফেরানোর আকুতি পরিবারের

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পশুয়া খাঁপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সানোয়ার হোসেনের পরিবারের স্বপ্ন ছিল বিদেশে উপার্জনের মাধ্যমে ঘুচবে দারিদ্র্যের গ্লানি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। চাকরির প্রলোভনে আইভরি কোস্টে নিয়ে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের অমানবিক নির্যাতনে সানোয়ারের প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে। আইভরি কোস্টের এক নির্জন কক্ষে জিম্মি থাকা অবস্থায় সানোয়ারের কণ্ঠে শেষবার শোনা গিয়েছিল—‘আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’

বিজ্ঞাপন

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান মিয়া ও তার ছেলে জাইদুর রহমান ওরফে রিয়াদ আইভরি কোস্টে লোক পাঠানোর নামে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাদের প্রলোভনে পড়ে কাউনিয়া উপজেলার গোড়াই গ্রামের জব্বার মিয়া ও পীরগাছার সানোয়ার হোসেন বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জনপ্রতি সাত লাখ টাকা চুক্তিতে দুই দফায় ১৪ লাখ টাকা রহমান ট্রেডার্স নামক প্রতিষ্ঠানে জমা দেন ভুক্তভোগীরা। সানোয়ারের পরিবার সংসারের ভিটেমাটি ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে বিদেশ যাত্রার অর্থের জোগান দিয়েছিলেন।

গত ১০ জানুয়ারি দেশ ছাড়ার পর আইভরি কোস্টে পৌঁছাতেই পাল্টে যায় চিত্র। বিমানবন্দর থেকে তাদের গ্রহণ করে ‘রাজু’ নামের এক দালাল চক্র। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি পরিত্যক্ত বাড়ির অন্ধকার কক্ষে। সেখানে কাজ দেওয়ার পরিবর্তে শুরু হয় জিম্মি করে অর্থ আদায়ের নির্মম প্রক্রিয়া। নির্যাতনের মুখে ভুক্তভোগীদের স্বজনদের কাছ থেকে আরও আট লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় দালালরা। এরপরও মুক্তি মেলেনি সানোয়ারের। অবশেষে গত ২২ এপ্রিল অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে সানোয়ারের মৃত্যু হয়।

প্রাণে বেঁচে ফিরে আসা জব্বার মিয়া জানান, দালালেরা অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের পাচার করেছে এবং তার চোখের সামনেই সানোয়ারের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর সানোয়ারের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন তার স্ত্রী হাজেরা বেগম ও ১২ বছর বয়সী সন্তান জুনাইদ। দরিদ্র পরিবারটির মরদেহ দেশে আনার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই। দীর্ঘ এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আইভরি কোস্টের মাটিতেই পড়ে আছে সানোয়ারের নিথর দেহ।

বিজ্ঞাপন

অভিযুক্ত আব্দুর রহমান মিয়ার পরিবারের বিরুদ্ধে এর আগেও নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, আব্দুর রহমান ও তার ছেলে রিয়াদ পরিকল্পিতভাবে নিরীহ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করে আসছেন। ভুক্তভোগীরা বিচারের দাবিতে পীরগাছা থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। তবে অভিযুক্ত রিয়াদ উল্টো বিষয়টি ‘আপস-মীমাংসার’ চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম খন্দকার মহিব্বুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে এবং দাখিলকৃত তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাইপূর্বক আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দেশজুড়ে এমন মানবপাচার রোধে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বর্তমান সরকার প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশনায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। পীরগাছার পশুয়া খাঁপাড়ার সেই বাড়িতে এখন শুধু একটি মরদেহের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে সানোয়ারের পরিবার।

0%
0%
0%
0%