মেয়ের আত্মহত্যায় চ্যাটজিপিটির ভূমিকার অভিযোগ, ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা

কানাডার ২৪ বছর বয়সী এক তরুণীর আত্মহত্যার ঘটনায় চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মামলায় দাবি করা হয়েছে, ওই তরুণীর কথোপকথনে আত্মহানির ঝুঁকির একাধিক সতর্ক সংকেত থাকা সত্ত্বেও ওপেনএআই যথাযথভাবে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি সংকটকালীন সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পরও চ্যাটজিপিটি পরবর্তী সময়ে তাকে সহায়তা নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মৃত তরুণীর নাম অ্যালিস ক্যারিয়ার। তিনি কানাডার মন্ট্রিলে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কাজ করতেন। নিউ ব্রান্সউইকের লরেন্স শহরে বেড়ে ওঠা অ্যালিস সম্প্রতি আবার গিটার বাজানো শুরু করেছিলেন। পাশাপাশি নতুন চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া, পোষা কুকুরের সঙ্গে সময় কাটানো এবং গেমিংয়ের মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন।

তবে পরিবারের অজান্তেই তিনি মানসিকভাবে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। ২০২৩ সালে কম্পিউটার ও গেমিং কনসোলের সমস্যা সমাধানের জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার শুরু করেন অ্যালিস। পরবর্তীতে একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং নিজেকে ভালোবাসাহীন মনে করার মতো অনুভূতি নিয়ে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত এই চ্যাটবটের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে শুরু করেন।

২০২৫ সালের ২ জুলাই অ্যালিস আত্মহত্যা করেন। তখন তার বয়স ছিল ২৪ বছর। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি তার মায়ের সঙ্গে শৈশবে দেখা কার্টুন নিয়ে বার্তা আদান-প্রদান করেছিলেন। তার মা ক্রিস্টি ক্যারিয়ার জানান, মেয়ের আচরণে এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত তিনি পাননি যে অ্যালিস গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ক্রিস্টি ক্যারিয়ার বলেন, তার মেয়ের জীবন তখন ভালো দিকেই এগোচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। তিনি নতুন চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন, নিজের পছন্দের কাজগুলোতে ফিরছিলেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একই সময়ে তার ভেতরে কী ধরনের মানসিক লড়াই চলছিল, তা পরিবার জানতে পারেনি।

অ্যালিসের মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার ওপেনএআই, চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি করেছে টেক জাস্টিস ল, সোশ্যাল মিডিয়া ভিকটিম ল সেন্টার এবং আইনজীবী প্রতিষ্ঠান সুসমান গডফ্রে।

মামলার আইনজীবীদের দাবি, ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার মধ্যে এটি অন্যতম। ৪৪ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অ্যালিসের কথোপকথনে আত্মহানির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার মতো একাধিক সংকেত ছিল। তারপরও ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তার পরিবার বা সংকটকালীন সহায়তা সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেনি।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি একপর্যায়ে অ্যালিসকে সংকটকালীন হটলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু অ্যালিস সেই পরামর্শে আপত্তি জানালে চ্যাটবট তাকে ওই ধরনের সহায়তা নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওপেনএআইয়ের GPT-4o মডেলের কিছু পরিবর্তনের পর চ্যাটবট ব্যবহারকারীর সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় সম্মতিপূর্ণ আচরণ করতে শুরু করে। এতে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীকে থামানোর পরিবর্তে চ্যাটবট তার বক্তব্যের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে একমত হয়ে যেতে পারে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

অ্যালিসের মা ক্রিস্টি ক্যারিয়ার ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের উদ্দেশে বলেন, যদি তার সন্তান এমন কোনো প্রোগ্রাম ব্যবহার করে একই ধরনের সংকটে পড়ত, তাহলে তিনি আশা করতেন কেউ যেন তার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য হস্তক্ষেপ করত।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, GPT-4o-কে এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যাতে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগ বজায় থাকে। অভিযোগকারীদের দাবি, চ্যাটবটটি মানুষের মতো সহানুভূতি ও বোঝাপড়ার অনুভূতি তৈরি করায় কিছু ব্যবহারকারী এর ওপর অযৌক্তিক মাত্রায় আস্থা স্থাপন করতে পারেন।

অন্যদিকে, ওপেনএআই জানিয়েছে, অ্যালিসের মৃত্যুর আগে ব্যবহৃত চ্যাটজিপিটির যে সংস্করণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেটি বর্তমানে আর চালু নেই। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র ড্রু পুসাতেরি বলেছেন, তারা আদালতে দাখিল করা অভিযোগ পর্যালোচনা করছে।

ওপেনএআই আরও জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের মানসিক সংকট শনাক্ত করা, ক্ষতিকর অনুরোধ নিরাপদভাবে পরিচালনা করা এবং বাস্তব জীবনের সহায়তার দিকে ব্যবহারকারীদের নির্দেশ করার জন্য তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, এই ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ওপেনএআই জানিয়েছিল, তারা চ্যাটজিপিটির এমন একটি আপডেট প্রত্যাহার করেছে, যা অতিরিক্ত মাত্রায় চাটুকার বা ব্যবহারকারীর বক্তব্যের সঙ্গে অতিরিক্ত সম্মতিপূর্ণ আচরণ করছিল। প্রতিষ্ঠানটি ওই আচরণকে ‘সাইকোফ্যান্টিক’ বা অতিরিক্ত তোষামোদপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

অ্যালিসের পরিবারের পক্ষ থেকে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বিচার চলাকালে নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি, আত্মহানির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথোপকথনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া কথোপকথন থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে।

ক্রিস্টি ক্যারিয়ার বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা যেন অন্য কোনো পরিবারের সঙ্গে না ঘটে—এটাই তার প্রধান লক্ষ্য। তার মতে, বিষয়টি শুধু তার পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

অ্যালিসের মৃত্যুর পর ওপেনএআই আত্মহানিসংক্রান্ত কথোপকথন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে নতুন মডেল উন্নত করার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, GPT-5 মডেলে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে সংকটে থাকা ব্যবহারকারীদের আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে।

তবে অ্যালিসের ঘটনা ঘিরে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনাতেও চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আরও একটি ঘটনায় কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় একটি স্কুলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে চ্যাটজিপিটির কথোপকথন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও ওপেনএআই ও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়ের করা একটি মামলাতেও চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে ব্যবহারকারীদের আত্মহানিতে উৎসাহিত করা এবং বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক চ্যাটবটের সঙ্গে মানুষের মানসিক নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় এ ধরনের চ্যাটবটের সহায়তা নিচ্ছে। এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের মানসিক সংকটে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে এবং কোন পর্যায়ে মানবিক হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ ও অঙ্গরাজ্য এআই চ্যাটবটের ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে। কানাডায় সংকট পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের বা অন্যদের ক্ষতি করতে পারেন—এমন ঘটনা সম্পর্কে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে এআই-ভিত্তিক থেরাপি সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার ফেডারেল পর্যায়ে এমন আইন প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী আত্মহানির কথা বললে তার অভিভাবকদের জানানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

অ্যালিস ক্যারিয়ারের মৃত্যুকে ঘিরে দায়ের হওয়া এই মামলা তাই শুধু একটি পরিবারের বিচারপ্রাপ্তির দাবি নয়; বরং মানসিক সংকটে থাকা মানুষের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং এআই নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

0%
0%
0%
0%