শুল্ক ও টোল বিরোধের জেরে মার্কিন উপস্থিতি ছাড়াই উদ্বোধন হলো ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সেতু

শুল্ক বণ্টন নিয়ে বিরোধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ নতুন ট্যারিফ আরোপের হুমকির মুখে কোনো মার্কিন কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়াই অত্যন্ত সাদামাটাভাবে উদ্বোধন করা হলো কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সংযোগকারী বহুল প্রতীক্ষিত ‘গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু’। দুই দেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক চরম কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার জেরে সীমান্ত পারাপারের জমকালো দ্বিপাক্ষিক ফিতা কাটার অনুষ্ঠানটি বাতিল করে কেবল কানাডীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই এই ঐতিহাসিক মাইলফলকটি উদযাপন করা হয়। আগামী সোমবার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই সেতুটি ওন্টারিওর উইন্ডসর এবং মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরকে সংযুক্ত করেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুটির সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেছে কানাডা সরকার। উইন্ডসর ও ডেট্রয়েটের মধ্যে দৈনিক প্রায় ২৭৪ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার (যা প্রায় ১৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য) মূল্যের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া এই দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোটি ডেট্রয়েট নদীর ওপর অবস্থিত পুরোনো ‘অ্যাম্বাসেডর ব্রিজ’-এর বিকল্প হিসেবে বাণিজ্য গতিশীল করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি কানাডার ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ট্রাম্পের হুমকি দীর্ঘদিনের দুই মিত্র দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে কালো মেঘের ছায়া ফেলেছে, যেখানে কানাডা তার মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশই মার্কিন বাজারে পাঠিয়ে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক বার্তায় দাবি করেছেন যে, পূর্ববর্তী প্রশাসনের দুর্বল দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি বাতিল করে তারা নতুন শর্ত যুক্ত করেছেন, যার ফলে সেতুর মোট লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র পাবে। তবে কানাডীয় নীতিনির্ধারকদের দাবি, ২০১২ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের আগে সেতুর কোনো টোল বা শুল্ক ভাগাভাগি করার সুযোগ নেই।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সেতু উদ্বোধনের এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানে অংশ নেন ওন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড, যেখানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মার্কিন সীমানায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। লাল ও সাদা জাতীয় রঙের পোশাকে সজ্জিত কানাডীয় নাগরিকদের এই উৎসবে ফোর্ড মন্তব্য করেন যে, মার্কিন শুল্ক নীতির কারণে সম্পর্ক চ্যালেঞ্জিং হলেও এই সেতু দুই দেশের সহযোগিতার এক অনন্য নিদর্শন। একই সাথে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ওন্টারিও মার্কিন চাপের মুখে কখনো নতি স্বীকার করবে না।

বিজ্ঞাপন

এই সেতু বিরোধের নেপথ্যে মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ডেট্রয়েটভিত্তিক পরিবহন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী ম্যাথিউ মরুন, যার পরিবার কয়েক দশক ধরে অ্যাম্বাসেডর ব্রিজ পরিচালনা করে আসছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ একটি রাজনৈতিক তহবিলে ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য উঠে এসেছে। নতুন এই সেতুর ফলে অ্যাম্বাসেডর ব্রিজের গাড়ি চলাচল ও বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় মরুন দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন।

কুইন্স ইউনিভার্সিটির বাণিজ্য নীতি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক নিকোলাস ল্যাম্পের মতে, ২০১২ সালের মূল চুক্তি এবং বর্তমান মার্কিন দাবির মধ্যে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে যা উভয় দেশকে নিজেদের জয় দাবি করার সুযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে, ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ডন অ্যাবেলসন মনে করেন, কোটি কোটি ডলারের ঋণ পুনরুদ্ধারের চেয়েও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

0%
0%
0%
0%