বস্ত্র খাতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি সত্ত্বেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে সংশয়

দেশের বস্ত্র খাতের সংকট নিরসন ও দেশীয় সুতার ব্যবহার উৎসাহিত করতে নগদ সহায়তার হার দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ১২ জুলাইয়ের নির্দেশনার আওতায় এই প্রণোদনা কার্যকর হবে, যা মূলত স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহারকারী রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য প্রযোজ্য। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজকোষ থেকে আনুমানিক তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের মতে, নগদ সহায়তা বৃদ্ধির এই উদ্যোগ বস্ত্র খাতের বিদ্যমান গভীর সংকট কাটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্পিনিং মিলগুলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং তারল্যসংকটের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন বা বিটিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫২৭টি স্পিনিং মিলসহ মোট এক হাজার ৮০০টিরও বেশি বস্ত্রকল রয়েছে, যেখানে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। অথচ জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারতীয় সুতার ব্যাপক আমদানি ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার দেশীয় শিল্পকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রায় ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছে, যার ৯০ শতাংশই এসেছে ভারত থেকে। নগদ সহায়তা হ্রাস পাওয়ার কারণে স্থানীয় সুতা ও আমদানিকৃত সুতার মূল্যের পার্থক্য কেজিপ্রতি ৪০ সেন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা আমদানির পালে হাওয়া দেয়। যদিও বর্তমানে সহায়তা ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, তবে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, প্রণোদনার ওপর ৫ শতাংশ কর কর্তনের পর প্রকৃত সহায়তার হার ৩ দশমিক ২ শতাংশের নিচে নেমে আসে। তাই আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য কর প্রত্যাহার ও সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজতর করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, ভারতীয় বস্ত্রকলগুলো প্রায় ১৩ শতাংশ সরকারি সহায়তা পায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় মিলগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ও ক্যাপটিভ জেনারেটরে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিটিএমএ’র পরিচালক খোরশেদ আলম ও মোশারফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেনের মতো শিল্প নেতারা মনে করেন, শুধুমাত্র নগদ সহায়তা বাড়িয়ে এই খাতকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এর জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।