গাজায় অস্ত্রবিরতি ও নিরস্ত্রীকরণে হামাসের সম্মতি, ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে সংশয়

গাজার যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই চুক্তির আওতায় হামাস তাদের অস্ত্র সমর্পণ ও নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় এই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি টেকনোক্র্যাটিক বা প্রযুক্তিবিদ নির্ভর ফিলিস্তিনি কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করবে ‘বোর্ড অব পিস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি মাইলফলক। নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক বাহিনীর সহায়তায় নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝে নেবে।
তবে এই ঘোষণা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ কাটছে না। হামাসের আলোচক গাজি হামাদ আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল যদি তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার না করে, তবে হামাস এই চুক্তির কোনো অংশই বাস্তবায়ন করবে না। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এর আগেও একাধিক চুক্তি ইসরায়েল মানেনি। গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১,১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং মানবিক সহায়তা প্রাপ্তিতে ক্রমাগত বাধা দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক স্টিফেন জুনেসের মতে, ইসরায়েল অতীতেও বিভিন্ন চুক্তির শর্ত নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ওয়াশিংটন যদি ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ না করে, তবে এই শান্তি উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া ইসরায়েলের অভ্যন্তরে উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিকরা গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন, যা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এদিকে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন নিয়েও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিতর্ক রয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন ও নরওয়ের মতো দেশগুলো এই বোর্ডের গঠনতন্ত্র নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সমালোচকদের ভয়, এই বোর্ড জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে অবজ্ঞা করে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গাজার সাধারণ মানুষের জন্য এই ঘোষণা এখন পর্যন্ত কেবলই শব্দমাত্র। গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি ইব্রাহিম আল-খলিলি জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিরা দৈনন্দিন প্রাণহানি ও চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের কাছে বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের এই নতুন প্রতিশ্রুতি কবে নাগাদ তাদের জীবনে সত্যিকার অর্থে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
