নীতি সুদহার হ্রাস মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে কতটা কার্যকর

দীর্ঘ দুই বছর কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার হ্রাস করে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। নীতিনির্ধারণী এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হলেও, অর্থনীতিবিদদের মতে এটিই বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার জন্য যথেষ্ট নয়। বাস্তবমুখী সংস্কার ছাড়া কেবল সুদহার কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ফলাফল অর্জন করা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশে টানা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। এতে এটি স্পষ্ট হয় যে, মূল্যস্ফীতির নেপথ্যে কেবল অতিরিক্ত চাহিদা দায়ী নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন, জ্বালানিসংকট এবং বাজারের অপ্রতিযোগিতামূলক কাঠামো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব ও কারসাজির সুযোগ থাকায় বাজার ব্যবস্থা কখনোই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি।
মুদ্রানীতির মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও তা কখনোই সমন্বিত রাজস্বনীতি কিংবা সরবরাহ পক্ষের কাঠামোগত সংস্কারের সহায়তা পায়নি। সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি ও রাজস্ব আহরণে ধারাবাহিকতা না থাকায় মূল্যস্ফীতির কাঠামোগত কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে গেছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির একটি স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত ভুল সংকেত দিতে পারে, কারণ খাদ্য সরবরাহ ও বিনিময় হারের অস্থিরতা বহাল থাকলে কম সুদহার কেবল চাহিদাই বাড়াবে, কিন্তু সরবরাহ না বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সুদের হারই একমাত্র অন্তরায় নয়। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতির অস্থিতিশীলতাকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। এর সাথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যোগ হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তীব্রতর হয়েছে। অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা কেবল ঋণের সুদ সামান্য কমলেই বড় কোনো ঝুঁকিতে যেতে আগ্রহী নন, কারণ ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আস্থার ভিত্তি সুদৃঢ় না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া দুরূহ।
নীতি সুদহার কমানোর ফলে বাজারে সাময়িক তারল্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ঋণগ্রহীতারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন, তবে এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প হতে পারে না। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কঠোর বাজার তদারকি, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসায়িক খরচ কমানোর পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করতে না পারলে কেবল একটি মুদ্রানীতির হাতিয়ার দিয়ে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়।
পরিশেষে, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এটাই প্রমাণ করে যে মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ সমস্যা বহুমাত্রিক, তাই এর সমাধানও হতে হবে বহুমুখী। সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক সংস্কার ব্যতীত নীতি সুদহার কমানোর এই সিদ্ধান্তটি কেবলই প্রত্যাশার সঞ্চার করবে, যা বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দিতে অক্ষম। টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে হলে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় ঘটানোর পাশাপাশি বাজারে কারসাজি ও অপ্রতিযোগিতামূলক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
