AdvertisementAdvertisement

যুদ্ধবিরতি চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা: এক কালপঞ্জি

পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তজনা চরম আকার ধারণ করেছে। ওয়াশিংটনের নতুন দফা বিমান হামলার বিপরীতে তেহরান একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার পাশাপাশি একটি যুদ্ধবিমানের ওপর গুলিবর্ষণের দাবি করেছে। এপ্রিলে ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ভাষ্যমতে, ইরানি বাহিনী কর্তৃক নৌ-মাইন বসানোর চেষ্টার জবাবে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে দক্ষিণ ইরানে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একটি মার্কিন ড্রোন তারা ধ্বংস করেছে এবং অপর একটি ড্রোন ও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার সমুচিত জবাব দেওয়ার বৈধ অধিকার তাদের রয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, কারণ যুদ্ধের মধ্যেই উভয় পক্ষ নিজেদের প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন বাহিনীর অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। দোহায় চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যেই বারবার সামরিক উসকানির ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাসের চিত্রটিই ফুটিয়ে তুলছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সরকারি তথ্যে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় আট মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৮৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ পর্যন্ত মোট ৩,৪৬৮ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯৬ জন নারী ও ৩৭৬ জন শিশু রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি হামলায় অন্তত ২৬ জন ইসরায়েলি নিহত এবং ৭,৭৯১ জন আহত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীও অঞ্চলে তাদের ১৩ জন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। লেবাননও এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত, যেখানে ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা ৩,২০০ ছাড়িয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

সংঘাতের আবহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল দাফরা অঞ্চলে বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে ড্রোন হামলার ঘটনা অঞ্চলটিতে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যদিও এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে সৌদি আরবের আকাশসীমায় ইরাক থেকে আসা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা আঞ্চলিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কুয়েত ও ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ড্রোন অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছে, যা চলমান যুদ্ধবিরতিকে কেবল একটি কাগজে কলমের চুক্তিতে পরিণত করেছে।

বর্তমানে কাতারের দোহায় উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন দফার আলোচনা চলছে। ইরান তাদের জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি এবং তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার শর্ত দিয়েছে। এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। তবে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির মতো জটিল বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিটি পক্ষ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের বিজয়ী প্রমাণ করতে চাইলেও, সামরিক সংঘাতের মাত্রা ও অবিশ্বাসের কারণে চূড়ান্ত কোনো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করা আপাতত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%