AdvertisementAdvertisement

ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘ছদ্মনামধারী’ রাজনৈতিক কমিটি ব্যবহার করে সমালোচকদের পরাস্ত করার অভিযোগ

ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের সমালোচক প্রার্থীদের পরাজিত করতে নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করার জন্য বিভিন্ন ‘ছদ্মনামধারী’ রাজনৈতিক তহবিল ব্যবহার করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীগুলোর একটি আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক তহবিলগুলো নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এক রাজনৈতিক তহবিল থেকে অন্য তহবিলে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থের উৎস আড়াল করা হচ্ছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ইলিনয়ের একটি কংগ্রেস নির্বাচনে এই কৌশলের অভিযোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে ৩০ সেকেন্ডের একটি নির্বাচনী বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। বিজ্ঞাপনে কংগ্রেস প্রার্থী বুশরা আমিওয়ালাকে ‘প্রকৃত অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার’ ও ‘প্রকৃত পরিবর্তনের’ পক্ষে লড়াই করা প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তবে আমিওয়ালা দ্রুত ওই বিজ্ঞাপন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। পরে প্রকাশিত সরকারি নথিতে দেখা যায়, বিজ্ঞাপনটি তার নির্বাচনী প্রচারণাকে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি। বরং এর অর্থায়নের সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত একটি রাজনৈতিক তহবিলের সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘শিকাগো প্রগ্রেসিভ পার্টনারশিপ’ নামে একটি রাজনৈতিক তহবিল বিজ্ঞাপনটির অর্থায়ন করে। নির্বাচনের আগে ওই তহবিলকে সরাসরি ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা কঠিন ছিল, কারণ তহবিলটির অর্থের উৎস প্রকাশের বাধ্যবাধকতা তখনও কার্যকর হয়নি।

নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথিতে দেখা যায়, ওই তহবিলের একমাত্র অর্থদাতা ছিল ‘ইলেক্ট শিকাগো উইমেন’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক তহবিল। সেটি এক কোটি ডলার অর্থ প্রদান করে।

পরবর্তী পর্যায়ে দেখা যায়, ইলেক্ট শিকাগো উইমেন ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীর নির্বাচনী শাখা ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ থেকে ৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পেয়েছিল। একই সঙ্গে ওই গোষ্ঠীর অন্যতম বড় দাতা বিনিয়োগকারী ব্লেয়ার ফ্রাঙ্কের কাছ থেকেও আরও ১ কোটি ডলার পেয়েছিল।

এছাড়া ‘অ্যাফোর্ডেবল শিকাগো নাউ’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক তহবিলে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার দিয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এ ধরনের একাধিক তহবিলের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করে নির্বাচনী ব্যয়ের প্রকৃত উৎস আড়াল করা হচ্ছে।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন ‘জাস্টিস ডেমোক্র্যাটস’-এর মুখপাত্র উসামাহ আন্দ্রাবি বলেন, ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করছে।

তার অভিযোগ, এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে এবং ভোটারদের অজান্তে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব বিস্তার করতে অর্থের জটিল কাঠামো ব্যবহার করছে।

ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কারণে তারা এখন নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা আড়াল করার চেষ্টা করছে।

তাদের মতে, এক রাজনৈতিক তহবিল থেকে অন্য রাজনৈতিক তহবিলে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারে অর্থের প্রকৃত উৎস লুকানো হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপেও ইসরায়েল সম্পর্কে মার্কিন জনগণের মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৭ শতাংশ মার্কিন ভোটার ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, যেখানে ৩৫ শতাংশ ইসরায়েলিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল।

গণতান্ত্রিক দলের সমর্থকদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতির হার আরও বেশি। তাদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।

আরেকটি জরিপে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক দলের ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।

সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তিত জনমতের কারণে আগে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন নেওয়া কিছু রাজনীতিবিদ এখন প্রকাশ্যে সেই সমর্থন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ডন’-এর নির্বাহী পরিচালক ওমর শাকির বলেন, অর্থের জটিল স্তরযুক্ত কাঠামো ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করা হচ্ছে।

তার অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থা শক্তির নয়, বরং রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনেও রাজনৈতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এমন কিছু সুযোগ রয়েছে, যা এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সহজ করে তুলতে পারে। ২০১০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়ের পর করপোরেশন ও বিভিন্ন সংগঠন নির্বাচনে সীমাহীন অর্থ ব্যয় করতে পারে, যদি তারা কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় না করে।

এছাড়া কিছু রাজনৈতিক তহবিলকে নির্বাচনের পর পর্যন্ত তাদের সব অর্থদাতার পরিচয় প্রকাশ করতে হয় না। আবার কিছু অলাভজনক সংগঠন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করলেও তাদের অর্থদাতাদের পরিচয় প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকে না।

বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীগুলো এই আইনি সুযোগগুলো ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য এগিয়ে নিচ্ছে।

পেনসিলভানিয়ার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গণতান্ত্রিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনেও অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রার্থী আলা স্ট্যানফোর্ড জোর দিয়ে বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর কাছ থেকে কোনো অর্থ পাননি।

তবে ওই নির্বাচনে তার পক্ষে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়কারী রাজনৈতিক তহবিলের সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর আগের আর্থিক সম্পর্ক ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনী পর্বে ওই তহবিলে ১০ লাখ ডলার স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনে ওই অর্থের সরাসরি প্রভাব কতটা ছিল, তা স্পষ্ট নয়।

কেনটাকিতেও ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসিকে পরাজিত করতে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরল রিপাবলিকান সমালোচকদের একজন।

ওই নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কংগ্রেস প্রাথমিক নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়কারী রাজনৈতিক তহবিলগুলোর অর্থদাতাদের সম্পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীটি সরাসরি ৩৬১ জন কংগ্রেস সদস্যের নির্বাচনী প্রচারে অর্থ দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত দাতাদের উৎসাহিত করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই তালিকায় রিপাবলিকান দলের নেতা মাইক জনসন এবং গণতান্ত্রিক দলের নেতা হাকিম জেফ্রিসের মতো শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদও রয়েছেন।

ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থন পাওয়া রাজনীতিবিদদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। উদারপন্থী রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি ডানপন্থী রাজনীতিবিদরাও এই সমর্থন পেয়েছেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার ২০২০ সালের স্মৃতিকথায় ওয়াশিংটনে ওই লবি গোষ্ঠীর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ইসরায়েলি নীতির তীব্র সমালোচনা করা রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ‘ইসরায়েলবিরোধী’ বা এমনকি ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিপুল অর্থায়ন পাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে পারতেন।

অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীটি তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি।

এদিকে, মানবাধিকার সংগঠন ‘ডন’ ওই গোষ্ঠীর কর্মী ও সাবেক কর্মীদের পেশাগত সম্পর্ক নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংগঠনটির সাবেক ৬৬ জন কর্মী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাদের কেউ কংগ্রেসে, কেউ হোয়াইট হাউসে এবং কেউ সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় কর্মরত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংগঠনটির প্রায় দুই ডজন বর্তমান কর্মী আগে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।

মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, এই ধরনের ‘ঘূর্ণায়মান দরজা’ বা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর্মীদের যাতায়াতের ফলে তৈরি ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

সংগঠনটি ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীকে তার নেতৃত্ব, পরিচালনা পর্ষদ, জ্যেষ্ঠ কর্মী ও বিভাগীয় প্রধানদের পরিচয় প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।

তাদের দাবি, একটি পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামোও প্রকাশ করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে সংগঠনটি কীভাবে পরিচালিত হয়।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, করমুক্ত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওই গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের কাছ থেকে পরোক্ষভাবে সুবিধা পায়। তাই তারা কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন নীতি প্রভাবিত করছে এবং কারা সেই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত—তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%