লাইবেরিয়ায় কুশ মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ও অপরাধী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সংকটে জনজীবন

লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়ার অলিগলিতে এখন ‘কুশ’ নামক এক মরণনেশার থাবা স্পষ্ট। অত্যন্ত সস্তা অথচ মারাত্মক আসক্তি সৃষ্টিকারী এই সিন্থেটিক মাদক দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশকে শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। প্রতিবেশী দেশ সিয়েরা লিওন থেকে ছড়িয়ে পড়া এই মাদক এখন লাইবেরিয়ার জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এটি কোনো নিছক পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিদিনের এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা।
মিয়াটা পায়ে নামের এক মায়ের অভিজ্ঞতা এই সংকটের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে। তার সন্তান ২০১৮ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম কুশের সংস্পর্শে আসে। ছেলের চিকিৎসায় তিনি দুইবার বিশাল অঙ্কের অর্থ ও চালের বস্তা ব্যয় করেছেন, যা তার পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে ছিল। কিন্তু প্রতিবারই সুস্থ হওয়ার আশায় হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ছেলেটি পুনরায় রাস্তার নেশার জগতে হারিয়ে গেছে। মায়েরা আজ অসহায় আর্তনাদ করে বলছেন, এই মাদক তাদের সন্তানদের তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছে।
লাইবেরিয়া সরকার ২০২৪ সালে মাদক সেবনকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অনেক তরুণ স্কুল ছেড়ে রাস্তায় আস্তানা গেড়েছে, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘জোগোস’ বলা হয়। আব্রাহাম জ্যাকসন নামের তেমনই এক যুবক জানান, মায়ের মৃত্যুর পর বাবার আশ্রয় হারানোয় তিনি নেশার অন্ধকারে তলিয়ে গেছেন। তার মতো অসংখ্য তরুণ পারিবারিক বিচ্ছেদ ও চরম দারিদ্র্যের সুযোগে এই মরণনেশার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।
দেশটিতে পুনর্বাসন কেন্দ্রের অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। মনরোভিয়া থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে বেন্টল সিটিতে সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে অসহায় পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বেসরকারি কেন্দ্রের শরণাপন্ন হচ্ছে, যেগুলোর অনেকগুলোরই কোনো সুনির্দিষ্ট তদারকি বা দক্ষ জনবল নেই। মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও বাড়ছে সংশয়।
লাইবেরিয়া ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত এক হাজার ১৬৭ জনকে মাদক চোরাচালানের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ এই বিশাল সংখ্যক গ্রেপ্তারের বিপরীতে আদালতে সাজার হার অত্যন্ত নগণ্য; প্রতি ১৪৬ জন গ্রেপ্তারের বিপরীতে মাত্র আটটি সাজার রেকর্ড পাওয়া গেছে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মূলত নিম্নস্তরের পাচারকারীদের ধরলেও মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আন্তর্জাতিক পাচার চক্রগুলো লাইবেরিয়াকে বড় আকারের মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে বলে প্রমাণ মিলেছে। গত জুন মাসে মার্জিবি কাউন্টির ডুয়াঝন এলাকায় পুলিশ চার টনের মতো কোকেন জব্দ করে, যা ছিল দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম চালান। প্রায় ৩১৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বিশাল চালানের পাশাপাশি এয়ারপোর্টেও জব্দ হয়েছে ১৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের কোকেন। পাচারকারীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ট্রামাডল বা ট্যাপেন্টাডলের মতো ওষুধের মোড়কে এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুশের রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই, তবে এর প্রভাব অত্যন্ত অনিশ্চিত ও প্রাণঘাতী। স্থানীয় বাসিন্দারা অপরাধীদের ধরিয়ে দিয়েও নিরাপত্তা পাচ্ছেন না, কারণ পুলিশের অভিযানের দু-এক দিন পরেই প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীরা এলাকায় ফিরে এসে হুমকি দিচ্ছে। সরকার কঠোর পদক্ষেপ ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সাধারণ মানুষের দাবি—শুধু মাদকসেবীদের ওপর নজর না দিয়ে এই মরণব্যবসা যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
