ইসরায়েল কি সত্যিই গাজা থেকে সরে আসতে প্রস্তুত?

ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস গাজা উপত্যকায় অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়েছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলকে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ধীরে ধীরে সেখানে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু এমন শর্ত ইসরায়েলের রক্ষণশীল রাজনীতিক ও জনগণের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো মন্তব্য না করলেও, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে, হামাসের প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে এক চুলও নড়বে না। একদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন যে ইসরায়েল এই চুক্তিতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নিজস্ব জোটের শরিকরাই এই সমঝোতাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করছেন।
জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই চুক্তিকে হামাসকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সুর শোনা গেছে বিরোধী দলীয় নেতা গাডি আইজেনকোটের কণ্ঠেও। তিনি মনে করেন, হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না করে এই যুদ্ধ বন্ধ করা ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে। বিশ্লেষকদের মতে, অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট তৈরি করেছে।
নির্বাচনে জয়ী হওয়া নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচতে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। জনমত জরিপগুলো বলছে, রক্ষণশীল ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে তাকে বর্তমান জোটের শরিকদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে, যারা গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের যেকোনো প্রস্তাবের ঘোর বিরোধী। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েল বিষয়ক অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানের মতে, নেতানিয়াহু এক কঠিন চক্রব্যূহে আটকা পড়েছেন; একদিকে তাকে ট্রাম্পের ক্ষোভ প্রশমন করতে হবে, অন্যদিকে নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়ের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে আপস করাও তার জন্য কঠিন।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের ধারণা, নেতানিয়াহু খুব সম্ভবত সরাসরি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করবেন না। এর পরিবর্তে তিনি হয়তো কোনো প্রতীকী সেনা স্থানান্তরের নাটক সাজিয়ে ট্রাম্পকে তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন, যাতে বাহ্যিকভাবে চুক্তির বাস্তবায়ন দেখালেও বাস্তবে গাজায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকে। গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহারের সম্ভাবনাকে নেতানিয়াহুর নিজস্ব আদর্শিক অবস্থানের পরিপন্থী বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েলের চালানো অভিযানে গাজায় অন্তত ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে চলমান জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, একটি বড় অংশ গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে মত দিচ্ছে। এমন চরমপন্থী জনমতের মাঝে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের যেকোনো উদ্যোগ নেতানিয়াহুকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা এখন নেতানিয়াহুর জন্য এক জটিল রাজনৈতিক ধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
