মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার ফুটবল বিশ্বে স্পেনকে নিয়ে অভূতপূর্ব ঐক্য

ফিফা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়ার প্রাক্কালে ল্যাটিন আমেরিকার বিশাল একটি অংশ এখন স্পেনকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। মেক্সিকো থেকে শুরু করে ব্রাজিল—পুরো মহাদেশ যেন একাট্টা হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া মিম এবং হাস্যরসাত্মক পোস্টগুলোই বলে দিচ্ছে, এবার মেসিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এক প্রবল জনমত। বিশেষ করে স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামালকে ঘিরে ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। অনেকেই ইয়ামালকে ব্রাজিলের জার্সিতে ফটোশপ করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করছেন, যার মূল বার্তা একটাই—আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে স্পেন।
ঐতিহাসিক ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও এই উত্তেজনার পেছনে কাজ করছে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ। অনেক সমর্থকের অভিযোগ, আর্জেন্টিনা বর্তমানে ফিফার ‘সোনালী ছেলে’ বা প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারের আসরেও রেফারিদের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কলম্বিয়ার সমাজবিজ্ঞানী জার্মান গোমেজ মনে করেন, আর্জেন্টিনার প্রতি ল্যাটিন আমেরিকার দীর্ঘদিনের ফুটবলীয় সংহতি এখন আর আগের মতো নেই। ডিজিটাল যুগের এই সময়ে ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন বয়ানগুলো আর্জেন্টিনা দলকে ফিফার আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা সাধারণ সমর্থকদের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ব্রাজিল বা মেক্সিকোর সাধারণ ফুটবল প্রেমীরা মনে করেন, ফুটবলের মাঠে দক্ষতা ও মেধার লড়াই হওয়া উচিত, রেফারিদের কৃপায় নয়। সাও পাওলোর এক ব্রাজিলিয়ান সমর্থক ফ্রানসিসকো সান্তোস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা চতুর্থবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে স্পেনের দ্বিতীয়বার শিরোপা জয় দেখা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। শুধু মাঠের খেলা নয়, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ওঠা বর্ণবাদ সংক্রান্ত অভিযোগও এই বৈরিতাকে আরও উসকে দিয়েছে। ফ্রান্সের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের নিয়ে অতীতে গাওয়া বিতর্কিত গান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক মন্তব্যের কারণেও আর্জেন্টিনা সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আর্জেন্টিনা দলের মনোভাব বেশ আক্রমণাত্মক। লিওনেল মেসি নিজে অবশ্য সমালোচকদের তোয়াক্কা না করে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা লড়াই করেই ফাইনালে উঠেছেন এবং কেউ তাদের কিছু বিনামূল্যে দেয়নি। আর্জেন্টাইনরা এখন তাদের ‘দুর্দান্ত ও অসহনীয়’ ইমেজকে পুঁজি করে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, যেখানে ভিন্ন দেশের সমর্থকরা আর্জেন্টিনা দলের আবেগ ও সাফল্য নিয়ে অভিযোগ করছেন। সব মিলিয়ে, রবিবার মাঠে গড়াতে যাওয়া ফাইনালটি কেবল একটি শিরোপার লড়াই নয়, বরং পুরো মহাদেশের আবেগ ও রাজনৈতিক আদর্শের এক শ্বাসরুদ্ধকর দ্বৈরথে রূপ নিয়েছে। যদিও পেরুর মতো কিছু দেশের সমর্থকরা এখনো আঞ্চলিক সংহতির খাতিরে আর্জেন্টিনার পক্ষেই দাঁড়িয়ে আছেন, তবে সামগ্রিক জনমত যেন এখন স্পেনের দিকেই ঝুঁকে আছে।
