অজিঙ্কা রাহানে সংকটের সারথি থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠার অসামান্য আখ্যান

ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে সুনীল গাভাস্কার, রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার কিংবা বিরাট কোহলিদের মতো মহাতারকাদের যে নিরঙ্কুশ নির্ভরতার জায়গা ছিল, অজিঙ্কা রাহানে সেই কাতারে কখনোই ছিলেন না। কিন্তু ঠিক সেই অনিশ্চয়তার আড়ালেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের এক অনন্য পরিচয়। এক দশকের দীর্ঘ টেস্ট ক্যারিয়ারে তিনি কখনো মূল আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন না, কিন্তু বিপদের মুহূর্তে দলের ‘এসওএস’ বা ত্রাণকর্তা হিসেবে তার জুড়ি মেলা ভার ছিল। কোনো আড়ম্বর ছাড়াই নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া রাহানে শেষ পর্যন্ত তার বর্ণাঢ্য ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন, যা ভারতীয় ক্রিকেটে সততা ও নিবেদনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

লর্ডসের সেই ঐতিহাসিক ২০১৪ সালের টেস্টে যখন ভারতীয় দল মাত্র ১৪৫ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন রাহানের সেই আগ্রাসী সেঞ্চুরিই দলকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনেছিল। ইশান্ত শর্মার সেই বিখ্যাত বাউন্সার ঝড়ের নেপথ্যে ছিল রাহানের লড়াই, যা তার ক্যারিয়ারের প্রকৃত স্বভাবের পরিচয় দেয়। কেবল লর্ডস নয়, মেলবোর্ন থেকে শুরু করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের পিচে যখনই ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ ধসে পড়েছে, তখনই দলের আস্থার প্রতীক হয়ে সামনে এসেছেন তিনি। অ্যাডিলেডের সেই লজ্জাজনক ৩৬ রানে অল-আউট হওয়ার পর মেলবোর্নে অধিনায়ক হিসেবে তার সেঞ্চুরি ও নেতৃত্ব দলকে যেভাবে উজ্জীবিত করেছিল, তা ভারতীয় টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা রূপকথার গল্প হয়ে থাকবে।

রাহানের ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। প্রয়োজনে তিনি দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, আবার দরকার হলে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করেছেন। দিল্লির মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এক টেস্টে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি কিংবা ইন্দোরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা ১৮৮ রানের ইনিংসটি তার ধৈর্য ও মানসিক শক্তির প্রমাণ। তিনি বরাবরই বিশ্বাস করতেন যে, কঠিন পিচে লড়াই করে রান তোলার আনন্দ অন্যরকম। তবে ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ফর্মের ছন্দপতন ও অফ-স্টাম্পের বাইরের বলে দুর্বলতা তাকে দীর্ঘসময় ভোগায়। ২০২২ সালে দল থেকে বাদ পড়ার পর রঞ্জি ট্রফিতে ৬৩৪ রান তুলে তিনি আবারও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে তার লড়াকু মানসিকতা ছিল আপসহীন।

কেবল টেস্ট নয়, আইপিএলেও তিনি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। চেন্নাই সুপার কিংসে যোগ দেওয়ার পর অভাবনীয় স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও তিনি নিজের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করেন। মুম্বাইয়ের ক্রিকেট ঘরানার কড়া অনুশাসন মেনে বড় হওয়া রাহানে ক্যারিয়ার শেষে ৫০৭৭ টেস্ট রান, ১২টি সেঞ্চুরি ও ২৬টি হাফসেঞ্চুরি নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন। পরিসংখ্যান হয়তো তাকে সেই কিংবদন্তিদের সারিতে রাখে না, কিন্তু দলের প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করার যে মানসিকতা তিনি দেখিয়ে গেছেন, তা অতুলনীয়। বিদায়বেলায় তার সেই অমর বাণী—‘আমি সবসময় আমার দেশ ও দলকে নিজের উপরে রেখেছি’—তার পুরো ক্যারিয়ারেরই নিখুঁত প্রতিফলন। এভাবেই পর্দার আড়াল থেকে উঠে আসা এক অকুতোভয় যোদ্ধা মাঠ ছাড়লেন, যার উত্তরাধিকার কেবল রেকর্ডে নয়, বরং তার অকৃত্রিম দেশপ্রেমে চিরস্থায়ী হয়ে রইল।

বিজ্ঞাপন
0%
0%
0%
0%