বিশ্বকাপ বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা ফিফায় গৃহযুদ্ধ ইন্তান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জোরালো

ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে এখন এক নজিরবিহীন অস্থিরতা। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ফুটবল পরিবার কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ১৯০৪ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে যে সুশৃঙ্খল কাঠামোতে বিশ্ব ফুটবল পরিচালিত হয়ে আসছে, তা এখন চরম সংকটের মুখে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করার যে প্রস্তাব ইনফান্তিনো রেখেছেন, তা বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার এই পরিকল্পনা জনসমক্ষে আসার পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইনফান্তিনোর প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের লভ্যাংশ বা অংশীদারিত্ব প্রাইভেট ইনভেস্টর বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’ এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে পারে। ফিফার ২১১ সদস্যের ফেডারেশনকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই বিতর্কিত প্রস্তাব সমর্থনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ৫৫টি সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত উয়েফা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ফিফা যদি এই প্রস্তাব প্রত্যাহার না করে, তবে তারা ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ বয়কট করবে। উয়েফার সাফ কথা—বিশ্বকাপ কোনো বিনিয়োগ পণ্য নয়, এটি ফুটবলের ঐতিহ্য। উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, স্বচ্ছতার অভাব এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও (এএফসি) উয়েফা ও কনকাকাফের অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। ফিফার অভ্যন্তরীণ এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরোর পদত্যাগে। দীর্ঘ ১১ বছরের শাসনামলে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত করদেইরোর এই বিদায় প্রেসিডেন্টকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। এএফসির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খালিফাও ফিফার বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী মাসে পোল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর কথা রয়েছে। আয়োজক পোলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি এখনো সূচি অনুযায়ীই চলছে। তবে আগামী নভেম্বরের মধ্যে পরবর্তী ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৬ সালের সফল বিশ্বকাপের পর যেখানে ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল ছিল, সেখানে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ফিফার এই গৃহযুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
