চট্টগ্রামে চালু হওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ পিংক বাস সার্ভিস উদ্বোধনের মাত্র এক মাসের মধ্যে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নারী চালকের পরিবর্তে পুরুষ দিয়ে বাস পরিচালনা, নির্ধারিত রুট না মানা, কর্মজীবী নারীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা না দেওয়া এবং শিক্ষার্থী পরিবহনে অতিরিক্ত ঝোঁকের কারণে শুরুতেই এই বিশেষ সেবাটি হোঁচট খেয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট নগরের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সামনে থেকে দুটি বাস উদ্বোধন করা হয়েছিল। ৭৫ আসনের দোতলা বাসটি কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার এবং ৪৫ আসনের একতলা বাসটি বালুছড়ার নতুনপাড়া থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচলের কথা ছিল। কিলোমিটারভেদে ভাড়াও নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০ থেকে ৬৮ টাকা। তবে সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাস দুটি কোনো নিয়মই সঠিকভাবে মানছে না।
নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে শেষ স্টেশনের আগেই বাস ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সিইপিজেড এলাকায় পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের যাতায়াত নিশ্চিত করার কথা থাকলেও সেখানে বাসগুলোর দেখা মিলছে না। বরং ৭৫ আসনের দোতলা বাসটিকে নির্ধারিত স্টেশনের দুই কিলোমিটার আগেই মাদরাসার শিক্ষার্থীদের তুলতে দেখা গেছে। বাসে নারী যাত্রীর তুলনায় শিক্ষার্থী ও পুরুষ যাত্রীদের আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া চালকের আসনে নারী থাকার কথা থাকলেও বেশির ভাগ সময় পুরুষ চালককেই দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
বাসে পুরুষ চালক রাখার বিষয়ে দোতলা বাসের চালক সুস্মিতা রানী দাবি করেন, যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের স্থানগুলোতে সহায়তার জন্য পুরুষ চালক রাখা হয়েছে। তবে পুরুষ চালক রাজু শেখ জানান, নারী চালকরা এখনো পুরোপুরি দক্ষ না হওয়ায় বিআরটিসি তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। বাসটির সুপারভাইজার শীলা আক্তারের ভাষ্যমতে, শহরে নারী যাত্রীর সংকট থাকায় প্রতিদিন মাদরাসার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের তোলা হয়। অথচ এর কিছুক্ষণ পরেই নগরের দুই নম্বর গেট এলাকা থেকে সাধারণ পুরুষ যাত্রীদেরও বাসে উঠতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, এই বাস সার্ভিস পরিচালনা নিয়ে অর্থনৈতিক সংকটও দেখা দিয়েছে। বিআরটিসি সূত্র জানায়, দোতলা বাসটিতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। জ্বালানি খরচ, চারজন কর্মীর খাবার ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে বর্তমানে বাস দুটি লোকসানে চলছে। চালক ও বিআরটিসির যথাযথ তদারকির অভাবেই কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে নারী চালক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন শ্রমিক শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ভারী লাইসেন্স পাওয়ার চেষ্টা করেও তা পাচ্ছেন না, অথচ মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণে নারী চালকদের ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। কালুরঘাট সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল আবছার দাবি করেন, গত এক সপ্তাহেই পিংক বাসের পাঁচটি দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। অদক্ষ ও তড়িঘড়ি করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকদের হাতে ৭৫ জন যাত্রীর নিরাপত্তা তুলে দেওয়াকে তিনি চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসন বাস সার্ভিসটির উদ্বোধন করলেও এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিআরটিসি, তাই অনিয়মের বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে বিআরটিসি চট্টগ্রাম বাস ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার কামরুজ্জামান দাবি করেন, নারী চালকদের বাড়ি চট্টগ্রামে না হওয়ায় তারা সড়কগুলো ভালোভাবে চেনেন না, সে কারণেই সহায়তার জন্য পুরুষ চালক রাখা হয়েছে এবং তারা দক্ষ হয়ে উঠলে এই ব্যবস্থা থাকবে না। পুরুষ যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ীই বাস দুটি পরিচালিত হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীরা এই সেবায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে কর্মজীবী নারীদের যাতায়াত নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।