সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রজ্ঞাপন বা গেজেট জারি হয়নি। এর ফলে দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও হতাশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেরই মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ঠিক কোথায় গিয়ে আটকে রয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই সময় অনুমোদনের পর দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট জারির কথা বলা হলেও দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ায় কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না, যা সবাইকে চিন্তিত করে তুলেছে।
অন্যদিকে সাবেক আমলারা বলছেন, গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের মতে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির আগে একাধিক জটিল প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এসব কাজ শেষ করতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত করতে হয়। এতে বিভিন্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা যুক্ত করা হয়। সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহর মতে, কেবল বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, সরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট করতে হয়। এসব বিষয় চূড়ান্ত করতেই মূলত দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর সাধারণত তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে আইনি যাচাই করা হয়ে থাকে। সেখানে সংবিধান ও বিদ্যমান আইন-কানুনের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে কি না এবং আইনি ভাষা ও পরিভাষার যথার্থতা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর খবর প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী গত রবিবার পর্যন্ত তা আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে এক-দুই দিনের মধ্যে খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে বলে জানানো হলেও রবিবার পর্যন্ত সেটি তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা অবশ্য আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, বিষয়টি আটকে থাকার মতো কিছু নয়। গেজেট প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও কারিগরি কাজ শেষ করতেই মূলত কিছুটা সময় ব্যয় হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশনা চূড়ান্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে এবং খুব শিগগিরই খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলেও চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হতে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছিল। অর্থাৎ সেবার অনুমোদন থেকে গেজেট প্রকাশে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় ব্যয় হয়েছিল। সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, এবারও একই ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হচ্ছে বিধায় কিছুটা বিলম্ব হওয়াকে অস্বাভাবিক মনে করার কোনো কারণ নেই।
প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে প্রায় ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং এটি ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
বর্তমানে দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল অপেক্ষা কেবল প্রজ্ঞাপন প্রকাশের। গেজেট জারি হলেই কেবল নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন, বেতন ফিক্সেশন এবং বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পরিশোধের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।