পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক কর্মরত থাকা সত্ত্বেও একজন অফিস সহকারীকে দিয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস রুটিনে ওই অফিস সহকারীর নামে সপ্তাহে ১৩টি ক্লাস বরাদ্দ রাখার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
রোববার দুপুরে সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে এই অনিয়মের সত্যতা মেলে। এ সময় বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক গোপাল চন্দ্র রায়কে দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ক্লাস নিতে দেখা যায়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ বর্তমানে মোট ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তবে ২০২৬ সালের প্রণীত ক্লাস রুটিনে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রুটিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক সপ্তাহে ছয়টি এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক আটটি ক্লাস নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া অন্য সহকারী শিক্ষকদের প্রত্যেকের নামের বিপরীতে ১২ থেকে ১৫টি করে ক্লাস বরাদ্দ রয়েছে।
সকল নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক গোপাল চন্দ্র রায়ের নামেও সপ্তাহে ১৩টি ক্লাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রুটিনের বিবরণ অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহের রোববার থেকে মঙ্গলবার পঞ্চম পিরিয়ডে ষষ্ঠ শ্রেণির ধর্ম এবং ষষ্ঠ পিরিয়ডে দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ক্লাস রয়েছে তার দায়িত্বে। এ ছাড়া বুধবার ও বৃহস্পতিবার ষষ্ঠ পিরিয়ডে নবম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং সপ্তম পিরিয়ডে দশম শ্রেণির ধর্ম বিষয়ের ক্লাসও নিয়ে থাকেন তিনি।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ওই সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন না। আর সহকারী প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার রায় দশম শ্রেণির মানবিক বিভাগের সাধারণ বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছিলেন। এ সময় শিক্ষক মিলনায়তনে তিনজন সহকারী শিক্ষককে অলস বসে থাকতে দেখা গেলেও অন্য শিক্ষকরা নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে নিয়োজিত ছিলেন।
অফিস সহকারী গোপাল চন্দ্র রায়ের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক আরিফুল জানান, তিনি তখন দশম শ্রেণিতে পাঠদান করছেন। পরবর্তীতে দশম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে গিয়ে গোপাল চন্দ্র রায়কে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয় পড়াতে দেখা যায় এবং ওই সময় কক্ষে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।
নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত অফিস সহকারী গোপাল চন্দ্র রায় জানান, ২০২০ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই শিক্ষক সংকটের অজুহাতে তিনি নিয়মিত পাঠদান করে আসছেন। মূলত ষষ্ঠ ও দশম শ্রেণিতে ধর্ম এবং নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ক্লাসগুলো তিনি পরিচালনা করে থাকেন। এ বছর প্রধান শিক্ষক রুটিনে তার নামে ক্লাস বরাদ্দ দেওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে তা পালন করছেন বলে জানান।
বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকার পরও বহিরাগত বা শিক্ষাক্রমের বাইরের কাউকে দিয়ে ক্লাস করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল আলম মুঠোফোনে জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে এমনটি করা হচ্ছে। তার দাবি, হিন্দুধর্মের শিক্ষক মনোরঞ্জন রায় দুই-তিন মাস পূর্বে অবসরগ্রহণ করায় সেই শূন্যতা পূরণে অফিস সহকারীকে দিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। তবে বিদ্যালয়ে আরও তিনজন হিন্দুধর্মের শিক্ষক কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তাদের বাদ দিয়ে কেন অফিস সহকারীকে ক্লাস নিতে হচ্ছে কিংবা এ বিষয়ে কোনো সরকারি পরিপত্র রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি প্রধান শিক্ষক।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পঞ্চগড় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খায়রুল আনাম মো. আফতাবুর রহমান হেলালীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ঘটনাটি সম্পর্কে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত সাহা জানান, একজন অফিস সহকারীকে দিয়ে নিয়মিত পাঠদান করানোর অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবীর বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হবে। শিক্ষক সমাজের মান ক্ষুণ্ণকারী এই ঘটনার দ্রুত তদন্তপূর্বক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকরা।