জমি থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা কাজে লাগাতে না পেরে চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত ভূল্লী উপজেলার অসংখ্য বাসিন্দা। চিকিৎসার খরচ মেটানো, ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া—সবকিছুই থমকে আছে দীর্ঘসূত্রতায়। চলতি বছরের ৭ মে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকারের) বৈঠকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভেঙে পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে ভূল্লীকে নতুন উপজেলা ঘোষণা করা হয়। নতুন এই প্রশাসনিক কাঠামোর সুফল পাওয়ার কথা থাকলেও, গত কয়েক মাস ধরে ভূমিসেবার তীব্র জট ও কাগজপত্রের জটিলতায় সাধারণ মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
পরবর্তী কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ভূল্লী বাজারের ব্যবসায়ী আরিফ জরুরি প্রয়োজনে নিজের জমি বিক্রি করতে চেয়ে বিপাকে পড়েছেন। নামজারি আটকে থাকায় ক্রেতার কাছে জমির মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। শুধু আরিফ একা নন, তাঁর মতো এলাকার বহু মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছেন না। অনেকেই জমি বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে প্রতিদিন ভূমি অফিসের বারান্দায় চক্কর কাটছেন।
ভূমি কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, ভূল্লী উপজেলা গঠনের আগে এই এলাকার ইউনিয়নগুলো ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভূমি অফিসের অধীনে পরিচালিত হতো। নতুন উপজেলা ঘোষণার পর ভূমি ব্যবস্থাপনার তথ্য ও দাপ্তরিক কার্যক্রম নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়। কিন্তু অদ্যাবধি ভূল্লী উপজেলার জন্য ভূমি কর্মকর্তা পদ সৃজন করা হয়নি। এর ফলে নামজারির আবেদন অনলাইনে জমা নেওয়া সম্ভব হলেও, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আইডিতে স্থানান্তর করে পরবর্তী আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। দাপ্তরিক এই জটিলতার কারণে ভূল্লী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দলিল সম্পাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় দলিল লেখকদের পেশাগত জীবনেও।
এদিকে, এই প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে একশ্রেণির দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনলাইনে নামজারির জটিলতা দ্রুত নিরসনের প্রলোভন দেখিয়ে তারা অসহায় সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও, উল্টো এই হযবরল অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই মারাত্মকভাবে বাড়ছে। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে নতুন উপজেলা পাওয়ার আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে এলাকাবাসীর।
ভূমিসেবার এই স্থবিরতার বিষয়ে ভূল্লী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, মন্ত্রণালয় থেকে এখনো ভূল্লী উপজেলার জন্য নির্দিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা পদ সৃজন করা হয়নি, যা এই জটিলতার মূল কারণ। ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দায়িত্বে থেকে বিষয়টি অনুধাবন করে তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, চলতি মাসের মধ্যেই এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান আসবে বলে তাঁরা আশাবাদী।