মাটির পাত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া, তালায় ফিরছে হারানো পেশা

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামের একটি আধুনিক মৃৎশিল্প কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ও নিপুণ কারুকার্যে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন দেখা যায়, কারখানার চুল্লির পাশে সারি করে সাজানো মাটির তৈরি থালা, একটু দূরে রোদে শুকানো হচ্ছে আকর্ষণীয় ফুলের টব ও ফুলদানি। কারখানার ভেতরে একের পর এক মাটির দলা মেশিনে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাচ্ছে তার আকৃতি। কোথাও চলছে মনের মাধুরী মিশিয়ে রঙের নিখুঁত কাজ, আবার কোথাও চলছে তৈরি হওয়া পণ্য চুল্লিতে পোড়ানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি; সব মিলিয়ে এক কর্মমুখর ও ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা।

একসময় যে পেশা কেবল পাল সম্প্রদায়ের পারিবারিক ঐতিহ্য ও জীবিকার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়ায় তা এখন লাভজনক ও সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপ নিয়েছে। এই কারখানায় বর্তমানে থালা, বাটি, কাপ-পিরিচ, মগ, জগ, বোতল, ফুলদানি, ফুলের টব ও নান্দনিক টেরাকোটাসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় মাটির তৈজসপত্র ও শৌখিন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদিত এসব পণ্যের একটি বড় অংশ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবসায়ীদের হাত ধরে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কারখানাটিতে গিয়ে দেখা যায়, মাটি প্রস্তুত থেকে শুরু করে পণ্য চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার প্রতিটি ধাপে চলছে সুশৃঙ্খল কর্মযজ্ঞ। প্রথমে স্থানীয় খাল-বিল থেকে সংগ্রহ করা মাটি বিশেষ মেশিনে ছেঁকে মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট ছাঁচে বসিয়ে জিগার মেশিনের সাহায্যে পাত্রের নিখুঁত আকার দেওয়া হয়। কারখানার কারুশিল্পী কামরুল ইসলাম জানান, সেখানে মোট ছয়টি জিগার মেশিন রয়েছে। গত তিন বছর ধরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং বর্তমানে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মেশিনে বিভিন্ন ধরনের পাত্র তৈরি করছেন। রঙের প্রলেপ দেওয়ার কাজে ব্যস্ত কারুশিল্পী অর্চনা পাল জানান, তিনি অভিজ্ঞ কারিগরদের কাজ দেখে এই নান্দনিক শিল্প রপ্ত করেছেন। খয়ের, সোডা, রংমাটি ও পানির বিশেষ মিশ্রণে তৈরি হয় এসব পণ্যের আকর্ষণীয় রূপ।

প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে মৃৎশিল্পীদের কায়িক পরিশ্রম বহুলাংশে কমে গেছে বলে মন্তব্য করেন প্রবীণ শিল্পী নমিতা পাল। তার মতে, আগে মাটি প্রস্তুত করতে যে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হতো, মেশিনের কল্যাণে সেই কাজ এখন অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। একইসঙ্গে কম সময়ে অধিক পণ্য উৎপাদিত হওয়ায় পণ্যের ফিনিশিং বা মান অনেক ভালো হচ্ছে এবং বাজারে এর ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে। পারিবারিক ঐতিহ্যের টানে এই পেশায় ফিরে আসা ললিতা পাল বলেন, তার ঠাকুরদাও মাটির জিনিসপত্র তৈরি করতেন; কিন্তু তার মৃত্যুর পর পরিবারের আর কেউ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। দীর্ঘদিন পর এই কারখানার মাধ্যমে তারা আবারও নিজেদের হারিয়ে যাওয়া পৈতৃক পেশা ফিরে পেয়েছেন।

মাটির পণ্য তৈরির এই আধুনিক রূপায়ন স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যেও দারুণ কৌতূহল ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। কারখানার পাশে ঘাস কাটতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম সরদার জানান, অতীতে তিনি কেবল পাল সম্প্রদায়ের মানুষকে খালি হাতে কষ্ট করে মাটির পাত্র তৈরি করতে দেখেছেন, কিন্তু আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে এত নিখুঁত ও দ্রুত কাজ করা সম্ভব—তা তার জানা ছিল না। কারখানায় তৈরি কাঁচা পণ্য পোড়ানোর জন্য রয়েছে মাটি ও ইট দিয়ে নির্মিত একটি বিশাল গোলাকার চুল্লি। এই চুল্লিতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য সাজিয়ে প্রথমে হালকা আগুন দিয়ে ধীরে ধীরে তাপ বাড়ানো হয়, যা কারিগরদের ভাষায় ‘তাওনা’ নামে পরিচিত। পুরো পোড়ানোর এই জটিল প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়।

০%
০%
০%
০%