পর্যটন চাকচিক্যের আড়ালে আলুটিলায় অন্ধকার জীবন

খাগড়াছড়ির অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ আলুটিলার সবুজ পাহাড়ি সৌন্দর্য আর রহস্যময় সুড়ঙ্গের টানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটকের ভিড় জমলেও, এর ঠিক বিপরীত চিত্র বিরাজ করছে সড়কটির অপর প্রান্তে থাকা আলুটিলা পর্যটন পাড়া ও পুনর্বাসন এলাকায়। চোখধাঁধানো পর্যটনকেন্দ্রের চাকচিক্য আর আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এই জনপদের প্রায় দেড়শ পরিবারের পাঁচ শতাধিক মানুষ এখনো বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধার চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ি এই জনবসতির বেশিরভাগ মানুষই নিম্নআয়ের এবং জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সময়ের বিবর্তনে জুমের ফলন হ্রাস পাওয়া এবং চাষাবাদের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় জীবিকার তাগিদে তারা এখন মূলত দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভর করছেন। পাশেই গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হলেও এলাকার সিংহভাগ বাসিন্দার জীবনমান আজও অন্ধকারে রয়ে গেছে। বিশেষ করে খাবার ও ব্যবহারের পানির তীব্র সংকট এখানকার মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রামকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

বর্ষাকালে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামা ঝরনার ধারা ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও, শুষ্ক মৌসুম শুরু হতেই এই জনপদে নেমে আসে চরম মানবিক বিপর্যয়। তখন খাবার পানির সন্ধানে নারী ও শিশুদের কয়েকশ মিটার থেকে শুরু করে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। পাহাড়ি পাদদেশের ছড়ায় কুয়া খুঁড়ে কোনো রকমে পানি সংগ্রহ করতে হয় স্থানীয়দের। তিনটি পাড়ার জন্য কেবল দুটি কুয়া থাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য ভোররাত থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরে থেকেও পর্যাপ্ত পানি মেলে না, যার ফলে এলাকার নারীদের প্রতিদিনের একটি বড় সময় কেবল পানি সংগ্রহের পেছনেই ব্যয় হয়। এছাড়া ওই কুয়ার পানিতে ময়লা-আবর্জনা এবং কেঁচো পাওয়ার মতো অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তাদের জীবন চালাতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির কষ্ট লাঘবে ইতিপূর্বে খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর রিজিয়নের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল। পাহাড়ের নিচের পুকুর থেকে পানি তুলে ট্যাংকে সংরক্ষণের এই ব্যবস্থাটি চালু থাকলেও বর্তমানে সেটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এর ফলে বিদ্যালয়টিতে দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে আসা কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও মারাত্মক পানির সংকটের শিকার হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ি ঝরনার পানি সংরক্ষণ ও পরিশোধন কিংবা গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে এই সংকট দূর করা সম্ভব হলেও দীর্ঘ দিনেও কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

পানির এই হাহাকারের পাশাপাশি এলাকায় প্রকট আকার ধারণ করেছে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব। প্রায় দেড়শ পরিবারের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবারের কোনোমতে টিনশেড শৌচাগার থাকলেও বাকি পরিবারগুলোকে অত্যন্ত নাজুক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে হয়। পানির অভাবে শৌচাগারগুলো পরিষ্কার রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ায় পুরো এলাকায় মারাত্মক পরিবেশদূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা নারী, শিশু ও প্রবীণদের জীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলছে। পর্যটনকেন্দ্রের নিকটবর্তী হওয়ায় সত্ত্বেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার এই চরম বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

০%
০%
০%
০%