কনেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন—কিন্তু কারও হাতে নেই কোনো উপহারের প্যাকেট কিংবা খাম ধরিয়ে দেওয়ার চিরচেনা আনুষ্ঠানিকতা। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত এমন একটি ব্যতিক্রমী বিয়ে গ্রামীণ সমাজে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। উপহার লেনদেনের প্রচলিত সামাজিক প্রথার বাইরে গিয়ে কেবল অতিথি উপস্থিতি ও দোয়ার ওপর নির্ভর করে আয়োজিত এই বিয়েটি এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে কনে সামিয়া ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বিয়েবাড়ির প্রধান ফটকে টাঙানো একটি বড় প্ল্যাকার্ডে পরিষ্কার ভাষায় লেখা ছিল, ‘সামিয়া ইসলামের শুভ বিবাহ। সম্মানিত অতিথি, বিয়েতে কোনো ধরনের উপহার গ্রহণ করা হয় না। আপনাদের উপস্থিতিতে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমাদের কন্যার জন্য আপনাদের দোয়াই আমাদের সেরা উপহার।’ এই সাইনবোর্ডটি নজরে পড়ার পর থেকেই আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে এক ইতিবাচক কৌতূহল ও প্রশংসার জোয়ার বইতে শুরু করে।
আমাদের সমাজে বিয়ে মানেই নানাবিধ উপহার সামগ্রী আদান-প্রদান এবং সামাজিক প্রথার এক অদৃশ্য চাপ। অনেক সময় নিমন্ত্রিতরা সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা কিংবা সামাজিক বাধ্যবাধকতার কারণে নিজেদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও মূল্যবান উপহার কিনতে বাধ্য হন। এই অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক ও প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতির বেড়াজাল ছিন্ন করতেই সামিয়ার পরিবার এই সাহসী ও পরিশীলিত উদ্যোগ গ্রহণ করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কনে সামিয়া ইসলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে প্রীতিলতা হলের নির্বাচিত কমনরুম সম্পাদক। তিনি পাকুন্দিয়া উপজেলার পুলেরঘাট আজহারুল উলুম হোসাইনিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাইয়ুমের কৃতি কন্যা। অন্যদিকে, বর নাসরুল্লাহ আল মারুফ একজন আমেরিকা প্রবাসী, যিনি উপজেলার মঙ্গলবাড়ীয়া এলাকার বিশিষ্ট বাসিন্দা আওয়াল মাস্টারের ছেলে। দুই পরিবারের এমন শুভবুদ্ধিভিত্তিক সিদ্ধান্তে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
পরিবারের এই মহৎ উদ্যোগের পেছনের ভাবনা সম্পর্কে কনের ছোট চাচা এস এম রায়হান জানান, উপহার গ্রহণ না করার এই সিদ্ধান্তটি পরিবারের সকলের সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আমন্ত্রিত অতিথিদের ওপর কোনো ধরনের আর্থিক বা মানসিক চাপ সৃষ্টি না করা। অতিথিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং নবদম্পতির সুখময় ভবিষ্যতের জন্য আন্তরিক দোয়াই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিয়েতে অংশ নেওয়া এলাকার তরুণ প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে জানান, উপহার দেওয়ার প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সামিয়ার পরিবার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। উপহারের চাকচিক্য ছাপিয়ে অতিথিদের উপস্থিতি ও দোয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার এই মহৎ উদ্যোগ আগামী দিনে সমাজের অন্যান্য বিয়েতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।