শিবচরে কর্মচঞ্চল নৌকা শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার সুতারবাড়ি এলাকায় বর্ষার আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প। বর্ষার পানিতে চারপাশের নদী-নালা ও বিল-ঝিল থইথই করে উঠতেই স্থানীয় কারখানাগুলোতে শুরু হয়েছে নৌকা তৈরির ধুম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত করাত ও হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা, যেখানে কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ কাঠের গুড়ি রূপ নিচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ডিঙ্গি নৌকায়।
একসময় গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল নৌকা। হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, রোগী পরিবহন কিংবা কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ায় ডিঙ্গি নৌকা ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন। তবে সময়ের পরিক্রমায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নদ-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই দৃশপট অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় নৌকার ব্যবহার এখন অনেক কমে এসেছে।
স্থানীয় কারিগর গণেশ সূত্রধর জানান, মূলত চাম্বল, আম ও কড়ই কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয় এবং একটি নৌকা নির্মাণ করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। নৌকা প্রতি প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হলেও বাজারে তা ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এসব নৌকা মাদবরেরচর ও উতরাইল হাটে বিক্রির পাশাপাশি অনেক ক্রেতা সরাসরি কারখানায় এসেও কিনে নিয়ে যান।
দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত শ্যামল সূত্রধর জানান, কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম এবং আগের মতো চাহিদা না থাকায় এই পৈতৃক পেশা টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও প্রতি বছর বর্ষা এলেই নতুন আশায় বুক বাঁধেন কারিগররা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পটি হয়তো আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ.এম. ইবনে মিজান জানান, নৌকা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জন্য সরকারি ক্ষুদ্র ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দারাও মনে করেন, নৌকা কেবল একটি বাহন নয়, বরং এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই শিল্প সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
