ক্রিস্টোফার নোলানের জাদুকরী মহাকাব্য দ্য অডিসি এবং ঘরে ফেরার মানবিক গল্প

সিনেমা জগতের কিংবদন্তি নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান এবার হাত দিয়েছেন তিন হাজার বছর পুরনো ধ্রুপদী মহাকাব্য ‘দ্য অডিসি’র ওপর। হোমারের অমর সৃষ্টিকে পর্দায় তুলে আনার নেশায় বুঁদ নোলান চিরাচরিত যুদ্ধের গল্পের খোলস ছেড়ে বের করে এনেছেন এক ক্লান্ত, অনুতপ্ত ও মানবিক ওডেসিয়াসকে। এই ওডেসিয়াস কেবল ট্রয় বিজয়ী বীর নন, বরং দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে শিকড়ের টানে ঘরে ফিরতে চাওয়া এক বিধ্বস্ত মানুষ। ম্যাট ডেমনের দুর্দান্ত অভিনয়ে ফুটে ওঠা ওডেসিয়াসের এই যাত্রা যেন দর্শককে নিয়ে যায় স্মৃতি আর অস্তিত্বের এক গোলকধাঁধায়।

বিজ্ঞাপন

সিনেমার প্রেক্ষাপটটি সাজানো হয়েছে ইথাকার রাজা ওডেসিয়াসের দীর্ঘ আট বছরের প্রত্যাবর্তনের গল্প নিয়ে। একদিকে ট্রোজান যুদ্ধের স্মৃতিতে বিদীর্ণ ওডেসিয়াস, অন্যদিকে আঠারো বছর ধরে স্বামীর প্রতীক্ষায় প্রহর গোনা স্ত্রী পেনেলোপে—যাঁর চরিত্রে অ্যান হ্যাথাওয়ে অসাধারণ সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। তাদের পুত্র তেলেমাকাসের ভূমিকায় টম হল্যান্ডের অস্থিরতা ও কৌতূহল গল্পের গতিপথকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তবে কেবল পারিবারিক টানাপোড়েন নয়, বরং সাইক্লোপস, জাদুকরী সার্সি চরিত্রে সামান্থা মর্টন কিংবা দেবী অ্যাথেনারূপে জেনডায়ার উপস্থিতি সিনেমাটিকে এক পৌরাণিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

১৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে রীতিমতো সুনামি তুলেছে ‘দ্য অডিসি’। এ পর্যন্ত ৩৯০ মিলিয়ন ডলার আয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশেও সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দর্শকের ভিড় আর ক্রমবর্ধমান শো’র সংখ্যাই প্রমাণ করে, মহাকাব্যিক এই রূপান্তর কতটা সফল। নোলানের ক্যারিয়ারের পূর্ববর্তী সিনেমা ‘ইনসেপশন’, ‘মেমেন্টো’ কিংবা ‘ওপেনহেইমার’-এর ছায়া এখানে স্পষ্ট। যেন দীর্ঘ দুই দশকের চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতায় তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এই বিশাল ক্যানভাসের মহাকাব্যটি তৈরির জন্যই।

পুরো সিনেমাটি ৭০ মিমি আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করে প্রযুক্তিগত এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছেন নোলান। হোয়টে ভ্যান হোয়টেমারের আলোকচিত্র আর লুডভিগ গোরানসনের সংগীতের মূর্ছনা দর্শককে নিয়ে যায় প্রাচীন গ্রিসের সেই ধূলিমলিন অথচ জাদুকরী জগতে। সিনেমার অসরলরৈখিক চিত্রনাট্য সময়ের সাথে লুকোচুরি খেলেছে, যা প্রতিটি মুহূর্তকে করেছে রহস্যময়। যদিও কিছু পৌরাণিক পর্বের সংক্ষিপ্তায়ন কিংবা রক্তহীন যুদ্ধের দৃশ্য দর্শকদের কারো কারো কাছে ধীরগতির মনে হতে পারে, তবুও সামগ্রিক বিচারে ‘দ্য অডিসি’ এক অভাবনীয় শিল্পকর্ম।

বিজ্ঞাপন

নোলান এখানে দেবতা কিংবা দানবের গল্প বলতে চাননি, বরং তিনি বলতে চেয়েছেন মানুষের ভেতরকার যুদ্ধের কথা। এটি সেই লড়াই, যা রণক্ষেত্রে জেতার চেয়েও কঠিন। ট্রয় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের ভার বয়ে চলা ওডেসিয়াস যখন অবশেষে নিজের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় কাতর হন, তখন দর্শকও অনুভব করেন সেই চিরায়ত সত্য—যুদ্ধ জয়ের চেয়েও বড় জয় হলো নিজের কাছে ফিরে আসা। দীর্ঘ সাত দশকের বিরতির পর হলিউডে হোমারের এই প্রত্যাবর্তন যেন আধুনিক চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক অভাবনীয় উপহার।

0%
0%
0%
0%