ভারতের প্রতিবাদী ইতিহাসে অনশন সংগ্রামের পরম্পরা ও প্রাসঙ্গিকতা

ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘অনশন’ বা ‘ভুখ হরতাল’ দীর্ঘ সময় ধরে এক শক্তিশালী ও অদম্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের দর্শন থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের কারান্তরীণ প্রতিবাদ এবং বর্তমান ২০২৬ সালে লাদাখের জলবায়ু কর্মী সোনাম ওয়াংচুকের লড়াই—এই দীর্ঘ পরম্পরা ভারতীয় জনমানসে অধিকার ও নৈতিক প্রতিরোধের এক অনন্য প্রতীক। অনশন কেবল খাদ্যাভ্যাস ত্যাগ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও প্রতিপক্ষের বিবেককে জাগ্রত করার এক আত্মিক লড়াই।

বিজ্ঞাপন

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী অনশনকে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেননি, বরং একে ‘সত্যাগ্রহ’ ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯১৮ সালের আমদাবাদ মিল ধর্মঘট থেকে শুরু করে স্বাধীনতার লড়াই এবং দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরসনে তিনি বারবার আমরণ অনশনে বসেছিলেন। তাঁর এই পদ্ধতি একদিকে যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে ব্যাকুল করে তুলেছিল, তেমনি দেশবাসীকে অহিংসার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় অনশনের আরেকটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯২৯ সালে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে। রাজনৈতিক বন্দিদের মর্যাদার দাবিতে শহীদ ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোদ্ধারা টানা ১১৬ দিনের অনশন শুরু করেছিলেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ৬৩ দিন অন্ন-জল ত্যাগ করে মাত্র ২৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বিপ্লবী যতীন দাস। তাঁদের এই ত্যাগের মহিমা তৎকালের যুবসমাজকে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

স্বাধীনতার পর নবগঠিত ভারতর রাজনৈতিক মানচিত্রেও অনশনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৫২ সালে ভাষার ভিত্তিতে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামুলু টানা ৫৬ দিন আমরণ অনশনের পর প্রাণত্যাগ করেন। তাঁর এই আত্মত্যাগের প্রেক্ষিতেই তৎকালীন ভারতর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সরকার ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়েছিল। একই ধারায় পরিবেশ ও নদী সুরক্ষায় ২০১৮ সালে অধ্যাপক ড. জিডি আগরওয়াল, যিনি স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ নামে পরিচিত ছিলেন, হরিদ্বারে পবিত্র গঙ্গা নদী রক্ষার দাবিতে ১১১ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ে লাদাখের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা এবং অঞ্চলটিকে সংবিধানের ষষ্ঠ তপশিলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হাড়কাঁপানো মাইনাস তাপমাত্রায় খোলা আকাশের নিচে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী অনশন প্রমাণ করেছে যে, অহিংস উপায়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব। এর পাশাপাশি মণিপুরের ইরম শর্মিলা সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন বা আফস্পার বিরুদ্ধে ১৬ বছর টানা অনশন করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন, যা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

২০১১ সালের আগস্ট মাসে দিল্লিতে দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রণয়নের দাবিতে সমাজকর্মী অন্না হাজারের ১১ দিনব্যাপী অনশনও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি করেছিল। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে অন্না হাজারে কিংবা সোনাম ওয়াংচুক—প্রত্যেকেই প্রমাণ করেছেন যে, বৃহত্তর স্বার্থে নিজের জীবনকে বাজি রেখে লড়াই করা যায়। অনশন তাই ভারতর ইতিহাসে কেবল একটি প্রতিবাদী ভাষা নয়, এটি ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের দীর্ঘস্থায়ী একটি নৈতিক দর্পণ হিসেবে টিকে থাকবে।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস

0%
0%
0%
0%