রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে মার্কিন শুল্কের খাঁড়া ভারতের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর গভীর উদ্বেগের ছায়া

রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন সেনেটে পাস হওয়া একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা বিল ঘিরে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের মুখে পড়েছে ভারত। ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণীত এই বিলে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। ৮৬-১২ ভোটে পাস হওয়া এই বিলটি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারী দেশ হিসেবে ভারত বড় ধরনের বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের খসড়া করা এই বিলে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মস্কোর জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তালিকায় থাকা ভারত, চিন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজারবাইজানের মতো দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের রাডারে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সফরের প্রাক্কালে এই বিলের অনুমোদন আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারত বর্তমানে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালীতে শিপিং জটিলতা তৈরি হওয়ায় ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। এমতাবস্থায়, মার্কিন বিলের অধীনে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে তা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

উল্লেখ্য, অতীতেও জ্বালানি বাণিজ্যের জেরে ভারত ও আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুন মাসে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি ৩৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড স্তরে পৌঁছায়। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের তথ্যমতে, ওই সময় এই আমদানির মূল্য ছিল ৪.৫ বিলিয়ন ইউরো, যা রাশিয়ার মোট রপ্তানি আয়ের ৩৬ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে চলমান বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনাও এই নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে স্থবির হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও মার্কিন সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানিকারী দেশগুলোর জন্য কিছুটা ছাড়ের সুযোগ থাকতে পারে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ কাটছে না। ভারত ইতিমধ্যে আমেরিকা আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্কের আওতাধীন ১৭টি দেশের তালিকায় রয়েছে, যা বন্ডেড বা জোরপূর্বক শ্রমের অজুহাতে আরোপ করা হয়েছিল।

সব মিলিয়ে, বিলটি চূড়ান্ত আইনে পরিণত হলে ভারতের জ্বালানি নীতি ও আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে। ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এই আইনের বাস্তব প্রয়োগের দিকেই এখন সতর্ক নজর রাখছে নয়াদিল্লি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও কৌশলগত অবস্থানের নিরিখে আমেরিকার সাথে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস

0%
0%
0%
0%