জলবায়ু স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও বাজেট বরাদ্দ কমছে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জনস্বাস্থ্য এক গভীর সংকটের সম্মুখীন হলেও, জাতীয় বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক তথ্যমতে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের হার ২০২১-২২ অর্থবছরের ২.৭৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের হিস্যা প্রায় ২.৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১.৫ শতাংশে ঠেকেছে। নীতিনির্ধারক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গত ৬ জুন ২০২৬ তারিখে ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), হেকস/ইপিইআর এবং সুশীলনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের নীতিসংলাপে এই চিত্র উঠে আসে। সংলাপে সিপিআরডি পরিচালিত দুটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়, যেখানে উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক বাস্তবতার ভয়াবহ দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, দারিদ্র্য, নিরাপদ পানির তীব্র সংকট এবং প্রতিকূল জলবায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রায় ৮২.৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নারী জানিয়েছেন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণের অভাবে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে। মাসিকজনিত জটিলতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, গর্ভপাত এবং প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের মতো শারীরিক সমস্যা উপকূলের নারীদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রেই পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ ও গাইনোকোলজিক্যাল সংক্রমণের লক্ষণ শনাক্ত করা হয়েছে।
আর্থিক কাঠামোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার প্রতিফলন বাজেটে নেই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) আওতায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত ৮৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটি স্বাস্থ্য খাতের। স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন থাকলেও, বর্তমান অর্থায়ন ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত এবং প্রকল্পভিত্তিক। এছাড়া জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি কেবল উন্নয়ন প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ, যা দীর্ঘমেয়াদি রোগ নজরদারি ও জরুরি প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমকে চরম অবহেলার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সংলাপে সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার জন্য বৈশ্বিক পরিসরে শক্তিশালী পরিমাণগত প্রমাণের প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব ড. শাহ আবদুল সাদী জলবায়ু বাজেট ট্যাগিং ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করার ওপর জোর দেন। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবির উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হয়, যা এই খাতের বৈশ্বিক অবহেলারই প্রতিফলন।
পরিশেষে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া, জলবায়ু বাজেট ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন উদ্যোগে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করে বলেন, সঠিক তথ্যের ঘাটতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা দূর না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
