পাকিস্তানের নাগরিক স্বাধীনতা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রথম স্টেট অব ফ্রিডম রিপোর্ট প্রকাশিত

পাকিস্তানের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং নাগরিক স্বাধীনতার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে বিদ্যমান বৈসাদৃশ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো ‘স্টেট অফ ফ্রিডম রিপোর্ট ২০২৬’ প্রকাশ করেছে মিশাল পাকিস্তান। রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেশের সুশাসন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল খাতের অগ্রগতির পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্বেগের চিত্রও ফুটে উঠেছে। দুই হাজার নাগরিকের ওপর পরিচালিত এই জরিপে উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহণকারী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের বর্তমান জনসংখ্যা ২৪ কোটি ৫০ লক্ষ ছাড়িয়েছে, যার ৬৪ শতাংশই ৩০ বছরের নিচে। ডিজিটাল বিপ্লবের ধারায় দেশটিতে ১৯ কোটি ৫০ লক্ষের বেশি মোবাইল সংযোগ থাকলেও নারী ও পুরুষের মালিকানার মধ্যে ২০ শতাংশ ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া দেশে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪ কোটি ৫০ লক্ষ এবং অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি ২ লক্ষ ৩০ হাজার কিলোমিটার ছাড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে পাকিস্তানের রপ্তানি আয় ৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে এবং ব্রাঞ্চলেস ব্যাংকিং সেবার গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি।
নাগরিক স্বাধীনতার সূচকে দেখা যায়, ৭৭ শতাংশ পাকিস্তানি পেশা নির্বাচনে এবং ৭৫ শতাংশ ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীন মনে করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে ৬৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্রও স্পষ্ট; শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া বিচার বিভাগে ক্রমবর্ধমান মামলার চাপ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সুপ্রিম কোর্টে ৫৯ হাজার, হাইকোর্টে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার এবং জেলা আদালতগুলোতে ১৭ লক্ষ ৪০ হাজারেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
কারাগারের ধারণক্ষমতা নিয়েও গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পাকিস্তানের কারাগারগুলোতে বর্তমানে ১ লক্ষ ২ হাজারেরও বেশি বন্দি রয়েছেন, যেখানে সিন্ধু প্রদেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে ১৬১ শতাংশ বেশি বন্দি গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ব্লাসফেমির অভিযোগে ২০২৪ সালে ৩৪৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পাঞ্জাবে ৬২ শতাংশ এবং সিন্ধু প্রদেশে ৩০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি সাধারণ মানুষের বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ৫৮ শতাংশ পাকিস্তানি তাদের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ৬৯ শতাংশ হলেও উচ্চশিক্ষার হার মাত্র ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া ৬২ শতাংশ নাগরিক মনে করেন সরকারি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের প্রভাব সীমিত এবং মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ দেশটির বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে আশাবাদী।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, ভুল তথ্যের বিস্তার, তীব্র পানি সংকট এবং দ্রুত নগরায়ণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনকে পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে নাগরিকরা অর্থনৈতিক সুযোগ, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর সুশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখছেন।
তথ্যসূত্র: দুনিয়া নিউজ