দাসপ্রথা ও ক্ষতিপূরণের আইনি বৈধতা নিয়ে ব্রিটিশ রাজের কাছে জ্যামাইকার আবেদন

ঐতিহাসিক দাসপ্রথা ও এর দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটছে জ্যামাইকা। ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রটির একটি প্রতিনিধি দল লন্ডনে পৌঁছেছে, যারা ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক পিটিশন দাখিলের উদ্যোগ নিয়েছে। এই পিটিশনের মাধ্যমে জ্যামাইকা ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছে দাসপ্রথার বৈধতা এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতির প্রতিকারের বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা চেয়েছে। এটি কমনওয়েলথভুক্ত কোনো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের ন্যায়বিচারের দাবিতে নেওয়া প্রথম কোনো আইনি পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জ্যামাইকার সংস্কৃতি, লিঙ্গ, বিনোদন ও ক্রীড়ামন্ত্রী অলিভিয়া গ্রেঞ্জ এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো কয়েক শতাব্দী ধরে দাসত্বের শিকার আফ্রিকান পূর্বপুরুষদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে জ্যামাইকার লুট হওয়া সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলো ফিরিয়ে আনা। লন্ডনে অবস্থানকালে প্রতিনিধি দলটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কর্মকর্তাদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনার পরিকল্পনা করেছে। এই উদ্যোগটি মূলত দাসপ্রথার অন্ধকার অধ্যায়কে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে এর দায়ভার নিরূপণের একটি সাহসী প্রচেষ্টা।

পিটিশনের মাধ্যমে জ্যামাইকা ব্রিটিশ রাজাকে লন্ডনে অবস্থিত প্রিভি কাউন্সিলের জুডিশিয়াল কমিটির কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রশ্ন উত্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছে। প্রশ্নগুলো হলো—ব্রিটিশ কমন ল-এর অধীনে আফ্রিকানদের দাস বানানো কি বৈধ ছিল, এটি কি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাজ্যের কোনো আইনি দায়বদ্ধতা রয়েছে কি না। ১৮৩৩ সালের জুডিশিয়াল কমিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী, ব্রিটিশ রাজা চাইলে যেকোনো আইনি বিষয়ে পরামর্শের জন্য এই কমিটির শরণাপন্ন হতে পারেন।

বাকিংহাম প্যালেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জ্যামাইকার এই আবেদনের বিষয়টি তাদের জানা আছে এবং রাজা সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবেন। তবে রাজপরিবারের মুখপাত্র স্পষ্ট করেছেন যে, দাবির বিষয়বস্তু বা এর ফলাফলের ওপর রাজার কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। এদিকে জ্যামাইকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সরাসরি ক্ষতিপূরণের অংক নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চায় না, বরং আগে আইনি ব্যাখ্যা ও সত্য উদঘাটনই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

উল্লেখ্য, সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর সময় পর্যন্ত ব্রিটিশ বণিকরা প্রায় ৬ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ আফ্রিকানকে জোরপূর্বক জ্যামাইকায় দাস হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল। ১৮৩৩ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্তির সময় ব্রিটিশ সরকার দাস মালিকদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছিল, যা পরিশোধ করতে গিয়ে যুক্তরাজ্যকে দীর্ঘ সময় ধরে ঋণগ্রস্ত থাকতে হয়েছিল। ইতিহাসের এই ক্ষত ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

০%
০%
০%
০%
বিজ্ঞাপন